‘Tiny Planters’-এর মাধ্যমে সাফল্যের সবুজ স্বপ্ন বুনছেন গুয়াহাটির শামিমা রহমান

Story by  Munni Begum | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
‘Tiny Planters’-এর মাধ্যমে সাফল্যের সবুজ স্বপ্ন বুনছেন গুয়াহাটির শামিমা রহমান
‘Tiny Planters’-এর মাধ্যমে সাফল্যের সবুজ স্বপ্ন বুনছেন গুয়াহাটির শামিমা রহমান
 
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি

জীবনে কখনও কখনও এমন সময় আসে, যখন পরিকল্পিত পথ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি পথ বেছে নিতে হয়। অনেকে সেই পরিবর্তনের কাছে হার মেনে নেন, আবার কেউ কেউ সেই বাধাকেই নতুন সম্ভাবনার দরজা হিসেবে গ্রহণ করেন। গুয়াহাটির উদ্যোগী তথা প্রাক্তন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষয়িত্রী শামিমা রহমানের জীবনও তেমনই এক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। কারণ শিক্ষকতার সফল কেরিয়ারের মাঝেই তাঁকে স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে নিয়মিত চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। কিন্তু সেই বাধা তাঁর সৃজনশীল মনকে আটকে রাখতে পারেনি। গাছপালার প্রতি আজীবন ভালোবাসা, শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে গুয়াহাটির বাসিন্দা শামিমা গড়ে তুললেন ‘Tiny Planters – A Gift That Grows’। আজ এই ছোট উদ্যোগটি শুধু ব্যবসা হিসেবেই নয়, একটি সবুজ জীবনদর্শন এবং অর্থবহ উপহারের পরিচয় হিসেবেও বহু মানুষের হৃদয় জয় করেছে।
 
২০০৯ সালে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর শামিমা শিলঙের ইংলিশ অ্যান্ড ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউনিভার্সিটি (EFLU), শিলং ক্যাম্পাস থেকে এমফিল এবং পিএইচডি সম্পূর্ণ করেছিলেন। গবেষণার সময়ই তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়েছিল। ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নগাঁওয়ের এডিপি কলেজের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করার পর ২০১৩ সালে বিয়ের পরে গুয়াহাটিতে এসে চাঁনমারিস্থিত অসম ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ইংরেজি বিভাগে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে এনইএফ (NEF) কলেজের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (HOD) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
 
 
শিক্ষকতা, গবেষণা এবং একাডেমিক জীবন, সব মিলিয়ে তাঁর কেরিয়ার সুন্দরভাবেই এগিয়ে চলছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যমজ কন্যাসন্তানের জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরেই গুরুতর স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা তাঁর জীবনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নিতে হয়েছিল। প্রায় দুই-তিন বছর ধরে চিকিৎসা চলার পাশাপাশি সন্তানদের যত্ন নিতে হওয়ায় তাঁকে নিয়মিত শিক্ষকতা থেকে দূরে থাকতে হয়।
 
আওয়াজ-দ্য ভয়েস-এর সঙ্গে এক কথোপকথনে ‘Tiny Planters – A Gift That Grows’-এর প্রতিষ্ঠাতা শামিমা রহমান সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, “শিক্ষকতা আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় পেশা ছিল। স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে হওয়াটা আমার জন্য সহজ ছিল না। শুরুতে আমার অনেক মানসিক কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম যে, জীবন নিশ্চয়ই আমাকে নতুন কিছু করার সুযোগ দেবে। সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।”
 
শামিমা রহমানের তৈরি করা সামগ্রী
 
বাড়িতে থাকার এই সময়টিই শামিমার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। বহুদিন ধরে মনের মধ্যে সযত্নে লালন করা গাছপালার প্রতি ভালোবাসা এবং সৃজনশীল শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহকে তিনি বাস্তব রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে নিজের বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের জন্য ছোট ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট সুন্দরভাবে সাজিয়ে উপহার হিসেবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। জন্মদিন, বিশেষ অনুষ্ঠান অথবা কলেজের সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রস্তুত করা এই সবুজ উপহারগুলি সকলের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। ধীরে ধীরে মানুষের মুখে মুখে তাঁর কাজের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনুষ্ঠান তথা জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির জন্যও তিনি প্রচুর অর্ডার পেতে শুরু করেন।
 
Tiny Planters-এর শুরুর কথা উল্লেখ করে শামিমা বলেন, “প্রথমে আমি ব্যবসা করার কথা একেবারেই ভাবিনি। শুধু নিজের ভালো লাগার কাজটি করে যাচ্ছিলাম। মানুষ যখন আমার গাছগুলি উপহার হিসেবে নিয়ে খুব পছন্দ করতে শুরু করল, তখনই অনুভব করলাম যে আমার এই শখই আমার নতুন পরিচয় হতে পারে।”
 
শামিমা রহমান তাঁর পরিবারের সঙ্গে
 
বর্তমানে শামিমা মূলত জেড প্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট এবং জেব্রা প্ল্যান্ট (Zebra Haworthia) ইত্যাদি বাড়ির ভিতরে রাখা যায় এমন (ইনডোর প্ল্যান্ট) গাছ সুন্দরভাবে সাজিয়ে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেন। কম যত্নে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা এই গাছগুলি বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাস বিশুদ্ধ করতেও সাহায্য করে। বিশেষ করে জেড প্ল্যান্ট এবং স্নেক প্ল্যান্ট উপহার ও গৃহসজ্জার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। তাঁর গাছগুলির দাম সাধারণত ₹২৫০ থেকে শুরু হয়। অন্যদিকে, বেশি সংখ্যক অর্ডারের ক্ষেত্রে ₹১৭০–₹১৮০ মূল্যেও পাওয়া যায়, যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ সহজেই এই সবুজ উপহার কিনতে পারেন।
 
তাঁর প্রতিটি প্ল্যান্টারে আলাদা আলাদা শিল্পকর্মের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। তিনি কোনও নির্দিষ্ট টেমপ্লেট অনুসরণ না করে নিজের কল্পনা ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে প্রতিটি ডিজাইন তৈরি করে আসছেন। তাঁর প্রতিটি ডিজাইনে গামছা, জাপি, জুট, মিরর ওয়ার্ক, রং, রিবন, ফুল ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে অসমীয়া ঐতিহ্য ও আধুনিক সজ্জার এক মনোমুগ্ধকর সংমিশ্রণ ঘটে। তিনি গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজড ডিজাইনও প্রস্তুত করেন। একবার একটি কলেজ থেকে মাত্র দুদিনের মধ্যে গামছা-থিমের প্ল্যান্টার তৈরির অর্ডার পেয়ে সীমিত সময়ের মধ্যেও সফলভাবে সেই কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন। এরপর থেকে একই ধরনের আরও অনেক নতুন অর্ডার পেয়েছেন।
 
 
ডিজাইনের প্রসঙ্গে শামিমা বলেন, “আমি কোনও ডিজাইন কারও কাছ থেকে কপি করি না। অধিকাংশ ডিজাইন আমি নিজেই তৈরি করি, যেগুলি হঠাৎ আমার মনে আসা কোনও চিন্তা থেকেই সৃষ্টি হয়। প্রতিটি প্ল্যান্টার আমার কাছে এক একটি শিল্পকর্ম। গামছা, জাপি, জুট বা অসমের সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে প্রতিটি টবকে একেবারে আলাদা রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি।”
 
প্ল্যান্টার তৈরির প্রতিটি পর্যায় শামিমা নিজের হাতে সম্পন্ন করেন। টব ধোয়া, রং করা, ডেকোরেশন, কোকোপিটে গাছ লাগানো, প্যাকেজিং করা, সব কাজই তিনি নিজে করেন। তিনি প্রতিটি প্ল্যান্টারের সঙ্গে “Write Your Wish Note” শীর্ষক একটি বিশেষ বার্তা-কার্ড সংযুক্ত করে দেন, যাতে গ্রাহক তাঁদের শুভেচ্ছা বা ব্যক্তিগত বার্তা লিখে উপহারটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলতে পারেন। শামিমা ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ করার পাশাপাশি বাড়িতে ডেলিভারির সুবিধাও প্রদান করেন।
 
 
শামিমা বলেন, “এই কাজে যথেষ্ট পরিশ্রম হয়, যদিও লাভও সন্তোষজনক হয়। ভালো ডেকোরেশন করা একটি গাছের টব (প্ল্যান্টার) সম্পূর্ণ করতে কখনও কখনও দুদিন পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। বেশি অর্ডার থাকলে দিনে প্রায় ১০টি টবই প্রস্তুত করা যায়। উন্নত মানের প্যাকেজিং, নিজেদের ব্র্যান্ডের লোগো এবং গুণগত সামগ্রীর জন্য খরচ কিছুটা বেশি হয়, যদিও গ্রাহকের সন্তুষ্টি সেই পরিশ্রমের মূল্য ফিরিয়ে দেয়। নতুন ব্যবসা হিসেবে শুরুতে আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই লাভের পরিমাণ কম রেখেছি। কখনও কখনও একটি টবে মাত্র ₹৭০-এর মতো লাভ রেখেও কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি, কারণ আমার লক্ষ্য হলো গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করা।”
 
তিনি আরও বলেন, “অনেকে আমাকে বলেন যে, আপনি যে টবগুলি তৈরি করেন সেগুলি খুব সুন্দর হয়, আপনি চাইলে এর দাম কিছুটা বাড়াতে পারতেন। কিন্তু আমার কাছে শুরুতে লাভের চেয়ে বিশ্বাস অর্জন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজও আমি চেষ্টা করি যাতে কম দামে উন্নত মানের এবং সৃজনশীল সামগ্রী গ্রাহকদের হাতে তুলে দিতে পারি।”
 
 
শুধু গাছ বিক্রি করেই শামিমা তাঁর দায়িত্ব শেষ করেন না। প্রতিটি গাছের সঙ্গে যত্নের পরামর্শও দেন এবং প্রয়োজন হলে ফোনের মাধ্যমেও গ্রাহকদের পরামর্শ দেন। বহু গ্রাহক ভালোবেসে তাঁকে “Plant Doctor” বলেও সম্বোধন করেন।
 
এই প্রসঙ্গে শামিমা বলেন, “আমি শুধু গাছ বিক্রি করি না। গাছটি বহু বছর সুস্থভাবে বেঁচে থাকুক, সেটাই আমার ইচ্ছা। সেই কারণেই প্রত্যেক গ্রাহককে গাছটির যত্ন নেওয়ার নিয়ম বুঝিয়ে দিই। অনেকে ভালোবেসে আমাকে ‘Plant Doctor’ বলে ডাকেন এবং সেই নামটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”
 
 
শামিমা ব্যবসায়িক দিকের পাশাপাশি সামাজিক দিকেও কাজ করার জন্য সমানভাবে আগ্রহী। সম্প্রতি এক পরিচিত ক্ষুদ্র উদ্যোগীর নিজের হাতে তৈরি রাখি শামিমা নিজের গিফট বক্সের সঙ্গে উপহার হিসেবে সংযুক্ত করেছেন। এর মাধ্যমে নিজের ব্যবসার পাশাপাশি অন্য একজন ক্ষুদ্র উদ্যোগীকেও আর্থিকভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি ব্যবসা শুধু নিজের লাভের জন্য হওয়া উচিত নয়। যদি আমার কাজের মাধ্যমে অন্য একজন ক্ষুদ্র উদ্যোগীকেও সাহায্য করতে পারি, তাহলে সেটাই আমার কাছে প্রকৃত সাফল্য।”
 
শামিমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও যথেষ্ট বিস্তৃত। তিনি আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত হতে চলা একটি প্রদর্শনী এবং অক্টোবর মাসের পুজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হতে চলা আরও একটি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি পুজোর জন্য বিশেষ থিমের ‘Tiny Planters’ তৈরি করার পাশাপাশি বড় আকারের প্ল্যান্টার, ইনডোর প্ল্যান্ট, ব্যালকনি গার্ডেন, ইনডোর গার্ডেন এবং ডেকোরেটিভ গ্রিন স্পেস ডিজাইনিংয়ের ক্ষেত্রেও পরিষেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন গ্রাহক তাঁদের নতুন ফ্ল্যাটের ব্যালকনি এবং ছোট বাগান সাজানোর জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
 
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শামিমা বলেন, “আমার লক্ষ্য শুধু Tiny Planters-এ সীমাবদ্ধ নয়। আমি আগামী দিনে গ্রিন ডেকোর সার্ভিস (Green Decor Service) গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষ শুধু গাছই নয়, সম্পূর্ণ সবুজ পরিবেশ তৈরির সুবিধাও পাবেন।”
 
শিক্ষয়িত্রী, গবেষক, মা এবং উদ্যোগী, এই সব পরিচয়কে একসঙ্গে সার্থকভাবে বহন করে চলা এই মহিলার যাত্রা একটি কথাই প্রমাণ করে যে, জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন সম্ভাবনা। “Tiny Planters – A Gift That Grows” আজ শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা এবং সবুজ জীবনশৈলীর এক অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।