শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পুলিশের কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। অপরাধ ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া, বিপদে মানুষকে উদ্ধার করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দৈনন্দিন কর্তব্যের তালিকায় থাকে এমনই নানা দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে যদি কোনও পুলিশকর্মী ভাবেন, ‘বিপদ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে বিপদের আগেই মানুষকে প্রস্তুত করা দরকার’, তখন তাঁর কাজ হয়ে ওঠে অন্যরকম। বীরভূমের পুলিশকর্মী কৌশভ সান্যালের গল্পটা ঠিক তেমনই।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগ ‘মিশন অনন্যা’র মাধ্যমে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মেয়েকে বিনামূল্যে মার্শাল আর্ট ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হয়েছে। সংখ্যাটা বড় হলেও কৌশভের কাছে এর আসল অর্থ সংখ্যায় নয়, বিপদের মুহূর্তে একজন মেয়ের ভয়কে আত্মবিশ্বাসে বদলে দিতে পারা।
বীরভূমের পুলিশকর্মী কৌশভ সান্যাল
এই যাত্রার শুরুটা অবশ্য কোনও সরকারি প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে হয়নি। দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের কামদুনি ধর্ষণের ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। অপরাধের ভয়াবহতা তাঁকে ভাবিয়েছিল, শুধু ঘটনার পরে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই কি দায়িত্ব শেষ? মেয়েদের যদি এমন কিছু শেখানো যায়, যাতে বিপদের মুহূর্তে তাঁরা অন্তত নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারেন?
সেই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে শুরু ‘মিশন অনন্যা’। প্রথমদিকে উদ্যোগটি ছিল সীমিত পরিসরে। কিন্তু ধীরে ধীরে স্কুল-কলেজ থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। বীরভূমের পাশাপাশি বর্ধমান, হুগলি-সহ বাংলার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যান কৌশভ। এমনকি দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডেও গিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। কোথাও একদিন, কোথাও আবার তিনদিন ধরে চলে প্রশিক্ষণ। কোনও জায়গাতেই এর জন্য মেয়েদের কাছ থেকে নেওয়া হয় না কোনও প্রশিক্ষণমূল্য।
কৌশভের প্রশিক্ষণের ধরনও খানিকটা আলাদা। মার্শাল আর্টকে তিনি শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চে পদক জেতার কৌশল হিসেবে দেখেন না। তাঁর লক্ষ্য বাস্তব পরিস্থিতি। আচমকা কেউ আক্রমণ করলে কীভাবে নিজেকে সামলাতে হবে, কেউ জোর করে ধরে ফেললে কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে, বিপদের মুহূর্তে কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই বিষয়গুলিই থাকে প্রশিক্ষণের কেন্দ্রে।
এমনকি আত্মরক্ষার জন্য হাতের কাছে থাকা সাধারণ জিনিস কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই ধারণাও দেওয়া হয় ছাত্রীদের। তাঁর বক্তব্য, বিপদের সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী বুদ্ধি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তি।
কৌশভ সান্যাল মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি দৃশ্য
মার্শাল আর্টের সঙ্গে কৌশভের সম্পর্ক অবশ্য অনেক পুরনো। মাত্র ১৪ বছর বয়সে শুরু হয়েছিল তাঁর প্রশিক্ষণ। ক্যারাটের পাশাপাশি জুডো, তায়কোয়ান্ডো, কুংফু এবং জিমন্যাস্টিক্সেও দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। বয়স ৪৮ হলেও অনুশীলনের অভ্যাস ছাড়েননি। বরং পুলিশের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে সময় বের করে এখনও পৌঁছে যান কোনও স্কুলের মাঠে, কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে।
শান্তিনিকেতন এলাকাতেও নিয়মিত বিনামূল্যে ক্যারাটের ক্লাস পরিচালনা করেন তিনি। সেখানে শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও প্রশিক্ষণ নেয়। অর্থাৎ তাঁর কাছে আত্মরক্ষা কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের বিষয় নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেকেরই এই দক্ষতা থাকা দরকার।
কৌশভের ভাবনায় আত্মরক্ষার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, মানসিক প্রস্তুতি। বিপদের মুহূর্তে আতঙ্কে স্থির হয়ে গেলে প্রশিক্ষণও অনেক সময় কাজে আসে না। তাই শারীরিক কৌশলের পাশাপাশি ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, দ্রুত পরিস্থিতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপরও জোর দেন তিনি।
তাঁর এই দীর্ঘ কাজের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। পেয়েছেন ২০২৫ সালের ন্যাশনাল চেঞ্জমেকার্স অ্যাওয়ার্ড এবং দিল্লির চেতন চৌহান আনসাং হিরো স্পোর্টস কোচ অ্যাওয়ার্ড। তাঁর কাজকে কেন্দ্র করে হিরো মোটোকর্পের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে একটি তথ্যচিত্রও।
সম্প্রতি বীরভূমের কীর্নাহার বালিকা বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ ছাত্রীকে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেন কৌশভ। স্কুলের শিক্ষিকাদের কথাতেও উঠে এসেছে এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। বর্তমান সময়ে ছাত্রীদের শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।
কৌশভ সান্যাল মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি দৃশ্য
কৌশভের দর্শন সহজ, মার্শাল আর্ট শেখা মানে কাউকে আক্রমণ করার শিক্ষা নয়; বরং বিপদের সময়ে নিজেকে বাঁচানোর ক্ষমতা তৈরি করা। তাই ছাত্রীদের তিনি বোঝান, প্রতিযোগিতার মাঠে নিয়ম থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তব বিপদে প্রথম দায়িত্ব নিজের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
এই কারণেই ‘মিশন অনন্যা’ ধীরে ধীরে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সীমা ছাড়িয়ে অন্যরকম সামাজিক উদ্যোগের চেহারা নিয়েছে। সাত হাজার নয়, দশ হাজার নয়, প্রায় ৭০ হাজার মেয়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে এই উদ্যোগ। প্রত্যেকের গল্প আলাদা, প্রত্যেকের ভয় আলাদা, কিন্তু প্রশিক্ষণের শেষে আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা যেন এক।
পুলিশের পোশাকে কৌশভ সান্যালের মূল দায়িত্ব অবশ্যই আইনরক্ষা। কিন্তু সেই দায়িত্বের বাইরে তিনি যে কাজটি করে চলেছেন, তার লক্ষ্য আরও একটু আগে পৌঁছনো, অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর নয়, তার সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হওয়ার আগেই মেয়েদের প্রস্তুত করা।
‘মিশন অনন্যা’র সাফল্য তাই শুধু কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সেই সংখ্যায় মাপা যায় না। এর আসল সাফল্য হয়তো সেই মুহূর্তে, যখন কোনও মেয়ে বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে আর নিজেকে অসহায় মনে করে না। ভয় থাকলেও জানে, নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্তত কিছুটা প্রস্তুতি তার আছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসই কৌশভ সান্যালের কাছে তাঁর এক দশকেরও বেশি সময়ের পরিশ্রমের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।