বিপর্যয়ের মাঝেও মানবতার আলো, বন্যাদুর্গতদের আশ্রয় হয়ে উঠল শিবসাগর গুরুদ্বার
Story by Ariful Islam | Posted by Aparna Das • 1 h ago
উজান অসমের বন্যাদুর্গতদের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেছে একটি গুরুদ্বার
আরিফুল ইসলাম/গুয়াহাটি
ভয়াবহ বর্ষার বন্যা উজান অসমের তিনটি জেলায় ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। চরাইদেও, শিবসাগর এবং যোরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরের ছাদ ছুঁয়ে বন্যার জল বইতে দেখা গেছে। এমন ভয়াবহ দুর্যোগের কথা এই অঞ্চলের মানুষ কল্পনাও করেননি। এই মহাবিপর্যয়ের সময় শিবসাগরের একটি গুরুদ্বার মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, মানবসেবাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। শিবসাগর জেলার ২০০টি বন্যাদুর্গত পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে ‘শিবসাগর গুরুদ্বার সাহেব’। শুধু তাই নয়, বন্যাদুর্গতদের জন্য প্রতিদিন তিনবেলা খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষা নির্বিশেষে সকলের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছে শিবসাগরের স্টেশন চারিআলির কাছে অবস্থিত ‘শিবসাগর গুরুদ্বার সাহেব’। গুরুদ্বারটিতে ২০০টি পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন ১,৫০০ থেকে ২,০০০ বন্যাদুর্গত মানুষকে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। প্রতিদিন তিনবেলা, সকালে চা, দুপুরে ভাত এবং রাতে ভাত, সরবরাহ করা হচ্ছে।
আওয়াজ দ্য ভয়েস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গুরুদ্বারের যুগ্ম রাজ্য সম্পাদক মনিন্দর সিং খালসা বলেন, “আমাদের গুরুদ্বারে আগে থেকেই লঙ্গরের ব্যবস্থা রয়েছে। মানবসেবা করাই আমাদের ধর্ম। তাই শিবসাগরের মানুষের এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের ধর্ম। শিবসাগরে বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা এলাকার মানুষের জন্য গুরুদ্বারের দরজা খুলে দিয়েছি। যাঁদের বাড়িতে জল ঢুকেছে, তাঁদের এখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। আমাদের গুরুদ্বারে ২০০টি পরিবার ভালোভাবে থাকার সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রতিদিন তিনবেলা খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
বন্যার কারণে গোটা এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গুরুদ্বারে আশ্রয় নেওয়া বন্যাদুর্গতদের জন্য জেনারেটরের ব্যবস্থা করেছে গুরুদ্বার কর্তৃপক্ষ। মোবাইল ফোন চার্জ করা এবং রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুমানোর জন্য পাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। মনিন্দর সিং বলেন, “বন্যাদুর্গতদের খাবার পরিবেশনের জন্য আমাদের গুরুদ্বারের রান্নাঘরে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শিবসাগর গুরুদ্বার সাহেব-এর এই উদ্যোগ দেখে আরও অনেক মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মারোয়ারি সমাজ, বিভিন্ন দল-সংগঠন এবং ব্যক্তিগতভাবে বহু মানুষ গুরুদ্বারের এই মহৎ উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন। গুরুদ্বারে আশ্রয় নেওয়া বন্যাদুর্গতদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য দুজন চিকিৎসক নিয়োগের আবেদনও জানিয়েছে গুরুদ্বার কর্তৃপক্ষ। মনিন্দর সিং বলেন, “আমাদের এখানে যদি দুজন চিকিৎসক এবং একটি চিকিৎসক দল দেওয়া হয়, তাহলেই যথেষ্ট হবে। ওষুধের ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করে নেব।”
বন্যার এক ভয়াবহ দৃশ্য
শিবসাগর শহরে শিখ সম্প্রদায়ের মাত্র ৫০টি পরিবার বসবাস করে। এই গুরুদ্বারটির দেখভালও এই ৫০টি পরিবারই করে। কিন্তু আজকের এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁরা বিপুল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের এই মহানুভবতা আবারও প্রমাণ করেছে যে, মানবসেবাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অসমের ২৫টি জেলার প্রায় ১৮ হাজারেরও বেশি গ্রাম বন্যার কবলে পড়েছে। এতে কমপক্ষে ৯ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪১ জন। অন্যদিকে, এখনও অন্তত ৭০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। হাজার হাজার গবাদি পশুও বন্যার জলে ভেসে গেছে। যদিও এগুলি সরকারি পরিসংখ্যান, অনেকের দাবি, বন্যায় মৃত ও নিখোঁজ মানুষের প্রকৃত সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।
অসম সরকার এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এখনও সব দুর্গত মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বহু এলাকায় মানুষ এখনও বন্যার জলের মধ্যেই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন কারণে উদ্ধারকারী দল তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। শিবসাগরের বিহুবর এলাকায় প্রায় শতাধিক মানুষ বন্যার জলে ভেসে গিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিধায়ক অখিল গগৈ। তবে সরকারি তথ্যে এ ধরনের কোনও উল্লেখ নেই।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বুধবার থেকে উজান অসমে অবস্থান করে তিনটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ত্রাণ শিবির পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন। এছাড়া এই দুর্যোগের সময় পরিস্থিতির সার্বিক তদারকির জন্য চারজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী শিবসাগর ও চরাইদেও জেলায় উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন কাজের তদারকি করছেন মন্ত্রী সুশান্ত বরগোহাঁই, কেশব মহন্ত এবং বিমল বড়া। অন্যদিকে যোরহাট জেলার পরিস্থিতির সার্বিক পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন মন্ত্রী অজন্তা নেওগ।