শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য রাজ্যে ট্রাইব্যুনালের শুনানি চলছে। প্রয়োজনে আবেদনকারীদের সরাসরি উপস্থিত থাকার নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে। এবার সেই নির্দেশ ঘিরেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে মুর্শিদাবাদের ফারাক্কায়।জানা গিয়েছে, ফারাক্কার আটজন মুসলিম আবেদনকারীকে ট্রাইব্যুনালের শুনানির জন্য আগামী ২৮ মে হাজির হতে বলা হয়েছে। কিন্তু ওই দিনই পালিত হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব কুরবানির ঈদ (বকরি ঈদ)। ফলে উৎসবের দিন শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের মধ্যে।
সূত্রের খবর, এসআইআর সংক্রান্ত ১১ নম্বর ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশে ওই আটজনকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তাঁদের ২৮ মে বেলা সাড়ে ১১টায় ফারাক্কা বিডিও অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাঁদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রকেশ শেখ, আব্দুল রশিদ, আকবর আলি মীর্জা, বিজয় মণ্ডল, আলফাজ শেখ, বিমল মণ্ডল, সাকিনা বিবি এবং তাকিউল শেখ। এঁদের সকলেরই অভিযোগ, ধর্মীয় উৎসবের দিন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করায় তাঁরা কার্যত সমস্যার মুখে পড়েছেন।আবেদনকারীদের বক্তব্য, কুরবানির ঈদ মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ওই দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিডিও অফিসে উপস্থিত হওয়া তাঁদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও।
নোটিশপ্রাপ্ত আবেদনকারী সাকিনা বিবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কুরবানির ঈদ মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলির মধ্যে একটি। ওই দিন শুনানির জন্য হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া অমানবিক। ধর্মীয় দায়িত্ব পালন এবং সরকারি নির্দেশ—দুইয়ের মধ্যে পড়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি।”অন্য আবেদনকারীদের একাংশের অভিযোগ, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবের দিন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবেই। তাঁদের আশঙ্কা, অনেকেই ওই দিন উপস্থিত হতে না পারলে তা তাঁদের মামলার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া বা প্রমাণ সামনে আসেনি।
কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশ
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ধর্মীয় উৎসবের দিন শুনানির তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল কি না। অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনাল বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।ফলে এখন নজর রয়েছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আবেদনকারীদের দাবি, শুনানির তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে অন্য কোনও কার্যদিবসে তাঁদের ডাকা হোক, যাতে ধর্মীয় উৎসব পালন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ—দুই দায়িত্বই সুষ্ঠুভাবে পালন করা সম্ভব হয়। এই বিতর্কের জেরে এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সংবেদনশীলতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বাতিল ভোটার সাকিনা বিবির বক্তব্য, “কুরবানির দিন আমাদের বড় উৎসব। সেদিন শুনানি রাখা অমানবিক। আমরা কীভাবে যাব?” ট্রাইবুনালের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে ছুটির দিন শুনানি রাখা হয়েছে যাতে হাজিরা দিতে না পারে। বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধীরাও।
সিপিএমের ফরাক্কার এরিয়া কমিটির সম্পাদক মোজাফফর হোসেনের অভিযোগ, ”বাঁতিল ভোটারদের হয়রানি করতেই এই চক্রান্ত। অবিলম্বে তারিখ বদলাতে হবে।” ফরাক্কার কংগ্রেস বিধায়ক মোতাব শেখ জানান, এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে নির্যাতন করেছিল। সেই ধারায় এখনও ট্রাইবুনালের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হয়রানি করা হচ্ছে। ইদের দিনে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের ট্রাইবুনালে ডাকার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাছি। মুর্শিদাবাদ জেলাশাসকের কাছে এবিষয়ে অভিযোগ জানাব।
যদিও ফরাক্কা বিডিও অফিসের তরফে জানানো হয়েছে, তারিখ নির্বাচন করেছে ট্রাইবুনাল। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। ফরাক্কা ব্লকের নির্বাচন দপ্তরের ওসি সাগর শ্রীবাস্তব জানান, ”যে সব বাতিল ভোটার নোটিস পাবেন ট্রাইবুনালের শুনানির আগের দিন তাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে যাবেন বিডিও দপ্তরে। এখান থেকে ট্রাইবুনালের বিচারকের কাছে তা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরের দিন বিডিও দপ্তর থেকে ভার্চুয়ালি ভাবে বিচারকের সামনে হাজির সওয়াল জবাব করতে পারবেন।’ এই অবস্থায় ভিডিও কনফারেন্সে শুনানিকে স্বাগত জানালেও ছুটির দিন হাজিরার নির্দেশে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
এই ঘটনায় চক্রান্তের অভিযোগ তুলে বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব অবিলম্বে শুনানির দিন পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।