শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
একবিংশ শতাব্দীর জলবায়ু সংকটের এই অস্থির সময়ে, যখন পৃথিবীজুড়ে জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, তখন কিছু মানুষের লড়াই নিছক পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম। পূর্ব হিমালয়ের কোলে এমনই এক নিঃশব্দ কিন্তু ঐতিহাসিক সংগ্রামের নাম বরখা সুব্বা। কালিম্পংয়ের এই পরিবেশকর্মী ২০২৬ সালে মর্যাদাপূর্ণ হুইটলি অ্যাওয়ার্ড বা ‘গ্রিন অস্কার’ অর্জন করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন ভারতের তৃণমূলভিত্তিক সংরক্ষণ আন্দোলনের এক উজ্জ্বল মডেল।
বরখা সুব্বার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পূর্ব হিমালয়ের এক বিরল, রহস্যময় এবং অত্যন্ত বিপন্ন উভচর প্রাণী, হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডার (Tylototriton himalayanus)। কোটি বছরের বিবর্তনের সাক্ষী এই প্রাণীকে বিজ্ঞানীরা ‘লিভিং ফসিল’ বা ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলে অভিহিত করেন। কারণ, পৃথিবীর প্রাকৃতিক ইতিহাসের বহু প্রাচীন স্তরের জীববৈচিত্র্যের এক জীবন্ত প্রতিনিধি এই স্যালাম্যান্ডার। কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন, পাহাড়ি অঞ্চলে লাগামছাড়া নগরায়ন, রাস্তা নির্মাণ, জলাভূমি ভরাট এবং প্রাকৃতিক জলাশয় কংক্রিটে ঢেকে দেওয়ার ফলে আজ এই বিরল প্রাণী অস্তিত্বের গভীর সংকটে।
বরখা সুব্বা
দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট, অগভীর, স্থির জলাভূমি ছিল হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডারের প্রধান প্রজননক্ষেত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো হয় বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো তথাকথিত সৌন্দর্যায়নের নামে কংক্রিট কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ডিম পাড়া, লার্ভা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জীবনচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ছিল, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই প্রজাতি স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
ঠিক এই সঙ্কটের মুহূর্তে বরখা সুব্বা সামনে আসেন একক এবং মানবিক উদ্যোগ নিয়ে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু গবেষণা নয়, এই প্রাণীকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন প্রকৃতি, বিজ্ঞান এবং স্থানীয় সমাজকে একসুতোয় গাঁথা। সেই ভাবনা থেকেই তিনি শুধু প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণে উদ্যোগী হননি, বরং বিকল্প প্রজনন ক্ষেত্র তৈরির মতো অভিনব পথও দেখিয়েছেন। নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং স্থানীয় সহযোগিতায় বাড়ির আশেপাশে ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে তিনি স্যালাম্যান্ডারের ডিম পাড়া ও বংশবিস্তারের নতুন নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলেছেন। যেখানে প্রকৃতির জলাশয় হারিয়ে গেছে, সেখানে মানুষ-নির্মিত জলাভূমিকে তিনি জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়ে পরিণত করেছেন।
বারখা সুব্বা যুক্তরাজ্যের প্রিন্সেস অ্যান-এর নিকট থেকে সম্মাননা লাভ করছেন
বরখা সুব্বার এই উদ্যোগ নিছক সংরক্ষণ নয়, এটি এক পরিবেশদর্শন। তিনি স্থানীয় মানুষদের বোঝাতে শুরু করেন, স্যালাম্যান্ডার কেবল একটি প্রাণী নয়; এটি পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ভারসাম্যের প্রতীক। তাঁর প্রচেষ্টায় স্থানীয় চা-বাগান শ্রমিক, শিক্ষার্থী, গ্রামবাসী ও আদিবাসী সম্প্রদায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। গড়ে ওঠে ‘স্যালাম্যান্ডার ফ্রেন্ডস’, এমন এক জন-অংশগ্রহণমূলক আন্দোলন, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেরাই হয়ে ওঠেন জীববৈচিত্র্যের রক্ষক।
দার্জিলিং ও কালিম্পং অঞ্চলের প্রায় ২০টি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি তাঁর নেতৃত্বে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। কংক্রিট সরিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে কাদা, প্রাকৃতিক পাথর, জলজ উদ্ভিদ এবং জৈব ভারসাম্য। কীটনাশকের ক্ষতি রুখতে তৈরি হয়েছে পরিবেশবান্ধব বেষ্টনী। এর ফলও মিলেছে বাস্তবে, নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্যালাম্যান্ডারের প্রজনন হার প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডার (Tylototriton himalayanus)
এই সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও গভীরভাবে স্বীকৃত হয়েছে। হুইটলি ফান্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থসাহায্য এখন বরখা সুব্বাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তাঁর লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরে আরও বহু ক্ষুদ্র জলাভূমি পুনরুদ্ধার করা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয়দের হাতে সংরক্ষণের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তুলে দেওয়া।
বরখা সুব্বার কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ আন্দোলন কেবল বৃহৎ নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়; একজন সচেতন মানুষের হাত ধরেও বদলে যেতে পারে একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ। তিনি প্রমাণ করেছেন, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস না করেও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান সম্ভব।
অন্যদিকে, চম্বল অঞ্চলে ইন্ডিয়ান স্কিমার রক্ষায় পারভীন শেখের কাজও প্রশংসনীয়। তবে বরখা সুব্বার লড়াই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, তিনি শুধু একটি বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করছেন না, তিনি হিমালয়ের নাজুক বাস্তুতন্ত্র, পাহাড়ি জলাভূমি এবং স্থানীয় পরিবেশ-সংস্কৃতিকে একসঙ্গে পুনর্জীবিত করছেন।
আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস বিশ্বমানবতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন বরখা সুব্বা এক শক্তিশালী বার্তা দেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। কালিম্পংয়ের পাহাড় থেকে তাঁর শুরু করা এই নীরব বিপ্লব আজ বিশ্বকে শিখিয়ে দিচ্ছে, ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’-কে বাঁচানো মানে কেবল একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং পৃথিবীর কোটি বছরের প্রাকৃতিক ইতিহাসকে ভবিষ্যতের হাতে সুরক্ষিত তুলে দেওয়া।