শ্রীনগরের বাজারে নিজের ভেড়া বিক্রি করছেন এক উপজাতি ব্যক্তি। (ছবি: বাসিত জারগার)
মৌলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান
ঈদ-উল-আজহা মুসলমানদের একটি বার্ষিক উৎসব, যা হিজরি ক্যালেন্ডারের শেষ মাস জিলহজ্জে পালিত হয়। এই মাসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হন হজ পালনের জন্য। ঈদ-উল-আজহা একই দিন উদ্যাপিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি হজের আংশিক প্রতিফলন এবং মুসলিম আন্তর্জাতিক সংহতির একটি দিন। নির্বাচিত কিছু মুসলমান মক্কায় গিয়ে হজ পালন করেন, আর বিশ্বের বাকি মুসলিম সমাজ নিজ নিজ দেশে ঈদ-উল-আজহা পালন করে। এভাবেই সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এই সংহতির দিনে সম্পৃক্ত হয়, কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে।
ঈদ-উল-আজহার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ত্যাগের ঈদ’। এদিন মুসলমানরা পশু কোরবানি করেন। এই কোরবানি প্রতীকী হলেও, প্রকৃত ত্যাগ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক, শুধু এক দিনের জন্য নয়, বরং পুরো জীবনের জন্য। এটি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, হজ এবং এর আনুষ্ঠানিকতাগুলো মূলত হজরত ইব্রাহিম, তাঁর পুত্র ইসমাইল এবং স্ত্রী হাজেরার জীবনের ঘটনাবলির প্রতীকী পুনরাভিনয়।
ঈদ-উল-আজহার ঐতিহাসিক পটভূমি হলো, হজরত ইব্রাহিম স্বপ্নে দেখেছিলেন যে তাঁকে তাঁর অল্পবয়সী পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাসী ইব্রাহিম সেই স্বপ্নকে বাস্তব নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তখন প্রায় ১০ বছর বয়সী পুত্রকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হন।
কিন্তু প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ ফেরেশতা প্রেরণ করে তাঁকে নির্দেশ দেন পুত্রের পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি করতে। আল্লাহর পরিকল্পনায় প্রকৃত ত্যাগ ছিল, ইব্রাহিমকে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে সেই সময়কার জনমানবহীন মরুভূমি মক্কার নিকটে স্থায়ীভাবে রেখে আসতে হয়েছিল। এই বসতি স্থাপন ছিল সেই পরিবারের জন্য এক বিশাল আত্মত্যাগ।
মরুভূমিতে এই ছোট পরিবারের অনন্য বসতি স্থাপন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। কয়েক বছর পর ইসমাইল একটি যাযাবর কাফেলার মেয়েকে বিয়ে করেন। এর মধ্য দিয়েই ‘ইসমাইলি’ নামে পরিচিত এক নতুন জাতিগোষ্ঠীর সূচনা হয়।
শ্রীনগরে বিক্রির জন্য রাখা একটি ভেড়ার ছবি
একটি প্রবাদ আছে, “সব মহান কিছুর শুরুতে একজন নারী থাকেন।” এই ক্ষেত্রে সেই প্রবাদ সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ, একজন নারী এবং তাঁর সন্তান শুধু একটি নতুন বংশই নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
এই প্রজন্ম প্রকৃতির মাঝে, নানান কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এক হাজার বছরের মধ্যেই এমন একটি জাতি গড়ে ওঠে, যাদের চরিত্র ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। এক ঐতিহাসিক যথার্থই বলেছেন, এটি ছিল “বীরদের জাতি”।
হজের সময় কিংবা ঈদ-উল-আজহার দিন মুসলমানরা যে সব আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন, তা মূলত হজরত ইব্রাহিম, তাঁর পুত্র ইসমাইল এবং স্ত্রী হাজেরার প্রতিষ্ঠিত সেই মহান ইতিহাসের প্রতীকী পুনরাবৃত্তি।
মূলত ঈদ-উল-আজহার দিনে মুসলমানরা দুটি প্রধান কাজ করেন, মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় এবং পশু কোরবানি। এই দুটি কাজ ঈদ-উল-আজহার মূল চেতনাকে প্রকাশ করে, যা দুটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অবস্থার সমন্বয়, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মনিবেদন। নামাজ আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ, আর কোরবানি আত্মনিবেদনের প্রতীক।
জয়পুরে হজযাত্রায় রওনা হওয়া এক মহিলা হাজিকে আবেগঘন বিদায় জানানোর দৃশ্য
ঈদ-উল-আজহা বিশ্বাসীদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রথমত, পরিবারের প্রধানকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার উন্নয়নের অংশ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ইতিহাসে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক প্রক্রিয়ার সূচনায় নারীকেও নিজের ভূমিকা পালনে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সব উৎসবই কোনো না কোনো ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত, যে ইতিহাস মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হতে পারে। যেমন দীপাবলি উৎসব অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয়ের প্রতীকী স্মারক। তেমনই ঈদ-উল-আজহা চার হাজার বছর আগের এক ইতিহাসের প্রতীকী স্মরণ, যা দেখায়, একটি ছোট দলের আত্মত্যাগ সমগ্র মানবজাতির জন্য নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।
ঈদ-উল-আজহা এক দিনের জন্য উদ্যাপিত হলেও, এর প্রভাব সারা বছর স্থায়ী হওয়া প্রয়োজন। ঈদ-উল-আজহা উচ্চ মানবিক মূল্যবোধের এক প্রতীকী অনুশীলন, আর সেই মূল্যবোধগুলোকে সারা বছর বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের লক্ষ্য।
(মৌলানা ওয়াহিদুদ্দিন খানের এই প্রবন্ধটি সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিটি ইন্টারন্যাশনাল ব্লগস্পট থেকে নেওয়া।)