তাপদাহ মোকাবিলায় বিশ্বমঞ্চে সাফল্য, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার গবেষকের অভিনব ছাদ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আওয়াজ - দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি
দিল্লির অসহনীয় গরম থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এক অভিনব প্রকল্প তৈরি করে সমগ্র বিশ্বের নজর কেড়েছেন এক ভারতীয় গবেষক। নেদারল্যান্ডসের ইরাসমাস ইউনিভার্সিটি এবং ইউরোপের খ্যাতনামা সংস্থা ‘ইনফর্ম টু বিল্ড’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘রিথিংকিং রুফস গ্লোবাল কম্পিটিশন’ নামের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার গবেষক ইউসরা গুল।
দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য উন্নত ও আরামদায়ক আবাসন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করাই ছিল এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য সেরা ধারণাকে পিছনে ফেলে ভারতের এই প্রকল্পটি নিজের শক্তিশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
কী এই বিশেষ প্রকল্প?
ইউসরা গুল বর্তমানে জামিয়ার স্থাপত্য বিভাগে গবেষণা করছেন। অধ্যাপক নিসার খান এবং অধ্যাপিকা হিনা জিয়ার তত্ত্বাবধানে তিনি এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করেছেন। এই বিশেষ প্রকল্পটির নাম রাখা হয়েছে ‘বিয়ন্ড স্কাই: কালেক্টিভ রুফস্কেপস অ্যাজ থার্মাল কমন্স ইন ইনফর্মাল সেটলমেন্টস’।
দিল্লির ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত বস্তি এলাকাগুলিকে কেন্দ্র করেই এই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে দিল্লির তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড স্পর্শ করে এবং এই বস্তিগুলিতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষজনই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন। ইউসরার এই প্রকল্পটি সেই জ্বলন্ত সমস্যার একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান তুলে ধরেছে।
সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম জামিয়ার গবেষক
প্রকল্পটির বৈশিষ্ট্য
এই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর সরলতা এবং কম খরচ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শত শত প্রকল্পের মধ্য থেকে এটি নির্বাচিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল এর বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা। সাধারণত স্থাপত্য সংক্রান্ত বড় বড় প্রকল্প অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে থাকে, ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেগুলি নিজেদের ঘরে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
কিন্তু ইউসরার এই মডেলটি বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ খুব সহজেই স্থানীয় স্তরে নিজেরাই ব্যবহার করতে পারবেন। এতে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে বাড়ির ছাদকে ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে। এই প্রযুক্তি ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। মানুষের জীবনযাত্রার মান সরাসরি উন্নত করার যে ক্ষমতা এই প্রকল্পটির রয়েছে, বিচারকমণ্ডলী বিশেষভাবে তার প্রশংসা করেছেন।
অধ্যাপক মজহার আসিফ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্ছ্বাস
এই বড় সাফল্যের পর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় এখন আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মজহার আসিফ সমগ্র গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামিয়া তার গবেষণার মাধ্যমে ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছে। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে আমাদের গবেষকরা সঠিক পথেই এগিয়ে চলেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মেহতাব আলম রিজভিও এই সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, যে কোনও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাজের সেবা করা। জামিয়া যে জাতি গঠনে নিজের সেরা অবদান রেখে চলেছে, এই স্বীকৃতিই তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
প্রকল্পটি
বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইউসরার প্রকল্পটিকে বিশ্বদরবারে এক বিশাল মঞ্চ এনে দিয়েছে। আগামী দিনে ‘ওয়ার্ল্ড আরবান ফোরাম’-এ এই গবেষক দলের উদ্ভাবন প্রদর্শিত হবে। পাশাপাশি বিশ্বের সেরা রুফিং সলিউশন নিয়ে প্রকাশিত হতে চলা একটি বিশেষ গ্রন্থেও এই ভারতীয় মডেলটি বিশেষ স্থান পাবে।
এই প্রযুক্তি নিয়ে আরও আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্য গবেষক দলকে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত হতে চলা একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেখানে তাঁরা বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানী ও স্থপতিদের সামনে এই অভিনব ভারতীয় মডেলের বিস্তারিত উপস্থাপনা করবেন। এটি শুধু জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার জন্যই নয়, সমগ্র দেশের গবেষক সমাজের জন্যও এক বিরল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সমাজের তৃণমূল স্তরের সমস্যার সহজ সমাধানও বিশ্বজয় করতে পারে।