'ডায়মন্ড মডেল' কি শেষের মুখে? ফলতার ফল ওলটপালট করে দিল বাংলার রাজনীতির চেনা সমীকরণ
তরুণ নন্দী,কলকাতাঃ
গত ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ৭ লক্ষাধিক ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে জিতে ‘ডায়মন্ড মডেল’-কে তুলে ধরেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। সে সময় ডায়মন্ড হারবার লোকসভায় মাত্র দু-বছরের মাথায় ২০২৬-এ সেই মডেলের অস্তিত্ব আসলে কি দেখিয়ে দিল ফলতার পুনর্নির্বাচন। বলা ভালো, এই কেন্দ্রের ফল বদলে দিল রাজ্যে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ। তৃণমূলের তথাকথিত ‘দুর্গ’ বলে পরিচিত ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত এই ফলতা বিধানসভায় তৃণমূলের এত খারাপ ফলাফল রাজনৈতিক মহলে একাধিক বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ২১ তারিখ ভোটের ঠিক আগে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর দলের মুখ পুড়িয়েছিল। আমি লড়ব না, বলে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তৃণমূল অস্বস্তিতে পড়ে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের এই হেভিওয়েট প্রার্থী জাহাঙ্গীর ইদানিং যিনি পুষ্পা নামে খ্যাত তিনি পালালেন সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আঁচ আঁচ করতে পেরেই। এনিয়ে কালীঘাটে দলের অন্দরে তীব্র মতানৈক্য তৈরি হয়েছিল। বিজেপি প্রায় ওয়াকওভার পেয়েই গিয়েছিল তবুও ভোটের পর যা ফল বের হল তাতে তৃণমূলের অবস্থা আগামীতে কোথায় দাঁড়াবে তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনতার অলক্ষ্যে এক বিরাট পরিবর্তনের হাওয়া তৈরি হচ্ছিল, যা টের পায়নি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও। ফলাফলে দেখা যায় যে জাহাঙ্গীর একসময় দাপিয়ে বেড়াতেন, তিনি সোজা চার নম্বরে ছিটকে গিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের ব্যাখায়, ফলতার মতো একটি সংখ্যালঘু ও মুসলিম প্রধান এলাকায় বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডার এই বিপুল লিড কিন্তু বাংলায় রাজনৈতিক সমীকরণের মোড় ঘুরিয়ে দিল। যে ভোটব্যাংককে তৃণমূল নিজেদের একচেটিয়া সম্পত্তি বলে মনে করত, সেখানে বিজেপির এই বিপুল জয় বার্তা দিল, সংখ্যালঘু সমাজও আর অন্ধভাবে তৃণমূলের ‘তোষণের বুলি’ গিলতে রাজি নয়। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং দুর্নীতির প্রশ্নে তাঁদেরও বোধহয় মোহভঙ্গ হয়েছে। যা ফলতার ব্যালট বক্স প্রকাশ করে দিল।
ফলতার বিজেপি কর্মীরা
ফলতায় বিজেপির বিরাট লিডের মাঝেই সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়ে ছাড়ল সিপিআইএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি। তিনি উঠে এলেন দ্বিতীয় পজিশনে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, তৃণমূল বিরোধী আসনে বসলেও বামপন্থীরাই যে শাসকের আসল বিকল্প হিসেবে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিকমহল। তাদের মতে, ফলতা তার অন্যতম বড় অক্সিজেন।
ভোট বিশ্লেষকদের মতে, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে কড়া কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় চলা এই গণনা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল অতীতে তৃণমূল কীভাবে ভোট করাতো। অবাধ ভোট হতেই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তেই অভিষেকের ডায়মন্ড মডেল আসলে কী তা বেরিয়ে গেল। ফলতার এই ফলাফল আসলে ‘ডায়মন্ড মডেল’-এর অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ২০২৬-এ তৃণমূলের সামগ্রিক পতনের এক আগাম সঙ্কেত।