মা গড়ছেন দুর্গা, মেয়ের ক্যানভাসে ফুটছে দশভূজা! দুর্গার রূপে মা-মেয়ের অনন্য শিল্পযাত্রা, মা-মেয়ের জুটিতে পুজোর আগে শিল্পের ‘চমক’
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 18 h ago
মা গড়ছেন দুর্গা, মেয়ের ক্যানভাসে ফুটছে দশভূজা! দুর্গার রূপে মা-মেয়ের অনন্য শিল্পযাত্রা, মা-মেয়ের জুটিতে পুজোর আগে শিল্পের ‘চমক’
তরুণ নন্দী / কলকাতা
মায়ের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে মাটির প্রতিমা, আর মেয়ের হাতে রং-তুলি। পারিবারিক শিল্পের ছায়ায় বেড়ে উঠছে বিশ্বাস পরিবারের দুই প্রজন্মের দুই শিল্পীসত্তা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের আশ্রমপাড়ার অনন্যা বিশ্বাস ও তাঁর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে পারিধি যেন নারীশক্তির এক অনন্য উদাহরণ।
পরিবারের শিল্পসত্তায় তাল মিলিয়ে মাটি থেকে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর অবয়ব। শিল্পীর হাতের কৌশলে একে একে তৈরি হচ্ছে প্রতিমার মুখ, হাত-পা, শরীরের গড়ন। সেই মৃন্ময়ী প্রতিমাকে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে রংয়ের প্রলেপ পড়লেই। আর ঠিক পাশেই রং-তুলি হাতে ছোট্ট পারিধি নিজের ক্যানভাসে এঁকে চলেছে দশভূজা দুর্গার ছবি।
মা-মেয়ের জুটিতে পুজোর আগে শিল্পের চমক
একই পরিবেশে পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে দুই শিল্পের দুই জগৎ। মায়ের হাতে মৃন্ময়ী মা, মেয়ের ক্যানভাসে চিন্ময়ী দেবী। জানা যায়, বংশপরম্পরায় তাঁরা মৃৎশিল্পী পরিবার। সংসারের গুরুদায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি অনন্যা বিশ্বাস নিজেও প্রতিমা গড়েন। তাঁর স্বামী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস এবং শ্বশুর প্রসেনজিৎ বিশ্বাসও দীর্ঘদিন ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পেশাকে এক রেখে পারিবারিক ঐতিহ্যকে যেন বিশ্বাস পরিবার নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন। ছোট্ট অনন্যা যেন এই শিল্পের পরবর্তী উত্তরসূরী।
পারিধির বাবা-মা জানান, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া মেয়ের কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। রং-তুলি হাতে দুর্গা, কালী, গণেশ, সরস্বতী সহ বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি এঁকে ফেলত। একেবারে ছোট থেকে যেন নিজের শিল্পীসত্তার পরিচয় তুলে ধরেছে সে। শুধু ক্যানভাসেই নয়, মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিমা তৈরির কাজেও আগ্রহের সঙ্গে হাত লাগায় ছোট্ট শিল্পী। মায়ের কাজ দেখেই মেয়েরও স্বপ্ন, একদিন সেও হবে হবে মৃৎশিল্পী।
বলা ভালো, এই পরিবারের বৌমা অনন্যার হাতে প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপ যেন মনে হয় এক একটি শিল্পপাঠ। মাটিকে মেখে তৈরি করা থেকে প্রতিমার কাঠামো তৈরি, অবয়ব গড়ে তোলা, চোখ আঁকা থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তের রং সব ঝক্কি একাই সামলে নিতে পারেন অনন্যা। আসলে সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা অভিজ্ঞতা। আর মাটির প্রতিমা তৈরির শিক্ষা চোখের সামনে দেখে শিখছে ছোট্ট পারিধি।
অনন্যার কাছে এই প্রতিমা তৈরি যেন একটা আবেগও। তাঁর কথায়, নিজের হাতে তৈরি প্রতিমা যখন বাড়ি ছেড়ে মণ্ডপের উদ্দেশে রওনা দেয়, তখন এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। বিসর্জনের সময় সেই আবেগ আরও গভীর হয়ে ওঠে। পরিবারের দাবি, এখানকার তৈরি করা একচালা দুর্গাপ্রতিমা-সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিমাগুলো চলে যায় রামকৃষ্ণ মিশন থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে।
অনন্যা বিশ্বাস মায়ের মূর্তি গড়ার একটি মুহূর্তে
এমনকি রাজ্যের নানা জায়গাতেও তাদের তৈরি প্রতিমার ভালো চাহিদা রয়েছে বলেও জানা যায়। বিশ্বাস পরিবারের একটা দিক খুবই লক্ষ্যনীয়, তাহল তাঁরা নিজের শিল্পের উত্তরাধিকারও তৈরি করছেন। গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, মেয়ে পারিধি শুধু ছবি আঁকছে না, নিজের স্বপ্নের ভিতও গড়ে তুলছে সে।
বলা ভালো, এই মা-মেয়ের পথচলায় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে নারীশক্তি ও নতুন প্রজন্মের সাহস। আজ বছর ১০-র পারিধি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রং-তুলি ধরেছে। আগামী দিনে এই ছোট্ট হাতেই হয়তো আরও বড় ক্যানভাসে ফুটে উঠবে নিজের স্বপ্নের পৃথিবী। আসলে স্বপ্নও এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে পৌঁছে যায় উত্তরাধিকারসূত্রে।