আরসলা খান / নয়াদিল্লি
১৪-১৫ বছর বয়সেই আলিগড়ের নাবিলা খান তার বড় স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে। নাবিলা একজন রোলার স্কেটার, যার রিঙ্কের ভেতরের ক্ষিপ্রতা ও চটপটেপনা সবাইকে মুগ্ধ করে। 'আওয়াজ - দ্য ভয়েস'-এর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নাবিলা খান বলেন যে, বিশ্ব মঞ্চে ভারতকে গর্বিত করাই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। তার কোচ এবং পরিবারের সদস্যরা আত্মবিশ্বাসী যে, তিনি শীঘ্রই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবেন।
যখন কোনো কিছু করার জন্য আপনার অদম্য ইচ্ছা থাকে, তখন এগিয়ে যাওয়ার পথ আপনাআপনিই খুলে যায়। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের (এএমইউ) বিএসসি বায়োকেমিস্ট্রির ছাত্রী নাবিলা খানের ক্ষেত্রে এই কথাটি পুরোপুরি প্রযোজ্য। পাঁচ বছর বয়সে ভাইকে স্কেটিং করতে দেখে তার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ সেই যাত্রাই তাকে রোলার ডার্বির জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
নাবিলা খান তার বাবার সাথে
পাঁচ বছর বয়সে শুরু হওয়া একটি যাত্রা
নাবিলার কাছে স্কেটিং শুধু একটি খেলা বা সময় কাটানোর উপায় নয়। সে এটিকে তার সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করে। এই খেলাটি তাকে প্রতিদিন জীবনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। সে প্রথম পাঁচ বছর বয়সে পায়ে স্কেট পরে স্কেটিং শুরু করে। ভাইকে স্কেটিং করতে দেখেও সে এই খেলাটি শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে স্কেটিং তার শখ এবং পরে নেশায় পরিণত হয়। শুরুতে পাওয়া ছোট ছোট পদক ও ট্রফিগুলো তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই খেলায় সে অনেক দূর যেতে পারবে। নাবিলার মতে, তার এই পুরো যাত্রাপথে পরিবার দৃঢ়ভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছে।
একটি সহায়ক পরিবেশ এবং উৎসাহী পিতামাতা
নাবিলার মা দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবার সঙ্গে জড়িত। ২০১৪ সাল থেকে তিনি এশিয়ানা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালনা করছেন। নাবিলের ভাষ্যমতে, তার মা খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাকে সবসময় উৎসাহিত করেছেন।
তার বাবা কুয়েতে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন এবং এখন অবসর নিয়ে বাড়িতে থাকেন। তার ভাইও তার অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করছেন। নাবিলা এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন যা তাকে শিক্ষা ও স্বপ্ন পূরণের পথে উৎসাহিত করেছে এবং নির্ভয়ে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
খেলাধুলার জগতে একজন মেয়ের পক্ষে নিজের জায়গা করে নেওয়া সবসময় সহজ হয় না। নাবিলাকেও তার পথে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তবে, তার বাবা-মা তাকে সাহায্য করা কখনো বন্ধ করেননি। পরিবারটি তার ক্রীড়ানৈপুণ্যের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল এবং তাকে নিজের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিল।
কোচের সাথে নাবিলা খান
তার বাবার কবিতা তাকে অনুপ্রাণিত রাখে
নাবিলার বাবা তাকে একটি কবিতা শুনিয়েছেন, যেটিকে সে তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস বলে মনে করে। বিখ্যাত কবি আহমেদ ফারাজের এই পঙক্তিগুলো তাঁর হৃদয়ের খুব কাছাকাছি:
"জো মেরে জাভত কা সিরাজ মুনতাসির কর দে,
মেরে সীতম কো ভি আব আইসা কোই সিতমগার দে।
এই কথাগুলো তাকে শেখায়, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও শান্ত থাকতে এবং নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে।
মোহালি শিবির ক্রীড়াজীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল
মোহালিতে ১০ দিনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেওয়ার পর নাবিলার ক্রীড়াজীবনে একটি বড় সুযোগ আসে। সেখানে তার দ্রুত গতি এবং ধারাবাহিকতা নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এরপর তিনি উত্তর প্রদেশ দলে নির্বাচিত হন। জাতীয় রোলার ডার্বিতে নাবিল ভালো পারফর্ম করেন। এখন পর্যন্ত তিনি তিনটি স্বর্ণপদকসহ পাঁচটি জাতীয় রোলার ডার্বি পদক জিতেছেন।
রাজস্থানের বিকানেরে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন কাপ রোলার স্কেটিং ডার্বি চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল নাবিলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় টুর্নামেন্ট। উত্তর প্রদেশ দলের হয়ে খেলে তিনি রিঙ্কে দুর্দান্ত সমন্বয়ের পরিচয় দেন। পুল পর্বে উত্তর প্রদেশ শক্তিশালী তামিলনাড়ুকে ৪৪-১১ ব্যবধানে পরাজিত করে। এরপর ফাইনালে দলটি স্বাগতিক দল রাজস্থানের মুখোমুখি হয়।
ফাইনালে রাজস্থানকে ২৬-১২ ব্যবধানে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছে উত্তর প্রদেশ। এই ঐতিহাসিক জয়ে নাবিলার গতি, নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলীয় সমন্বয় এবং কৌশল
রোলার ডার্বিতে শুধু দ্রুত স্কেটিং করাই যথেষ্ট নয়, দলীয় সমন্বয়, নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং সঠিক কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাবিলা বলেছেন যে তিনি ম্যাচের সময় সতীর্থদের সাথে সমন্বয় সাধনের উপর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। এই একই কৌশল উত্তর প্রদেশ দলকে বিকানেরে স্বর্ণপদক জিততে সাহায্য করেছিল।
শিক্ষা ও খেলাধুলার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য
নাবিলার গল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও সমান পারদর্শী। সে এএমইউ-তে বিএসসি বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশোনা করছে। স্কেটিংয়ের মহড়া, টুর্নামেন্ট এবং কলেজের পড়াশোনা একসাথে সামলানো সহজ নয়। তবে নাবিলা বিশ্বাস করে যে, সঠিক সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পড়াশোনা এবং খেলাধুলা দুটোই সফলভাবে সামলানো সম্ভব।
নাবিলা খান
নাবিলা দুইবার নিট (NEET) পরীক্ষাও পাস করেছে। এটি প্রমাণ করে যে তার মনোযোগ শুধু খেলাধুলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, সে তার পড়াশোনাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। নাবিলা প্রতিদিন তার ফিটনেস ও স্ট্যামিনা নিয়ে কাজ করে। সে বিশ্বাস করে, একজন ক্রীড়াবিদকে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।
জেন জি প্রজন্মের জন্য একটি বিশেষ বার্তা
বর্তমান প্রজন্ম, জেন জি-এর একজন সদস্য হিসেবে নাবিলাও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। তবে, সোশ্যাল মিডিয়া তার কাছে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। তিনি তার প্রজন্মকে নির্ভীক তরুণ হিসেবে দেখেন, যারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চায়।
নাবিলার মতে, সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে তরুণদের উচিত একে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করা। তিনি বলেন, “কেউ আপনার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুললে, তাকে চাপ হিসেবে না নিয়ে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করুন।” একই সাথে, তিনি তরুণদের চাপের মুখে কোনো কাজ না করার পরামর্শ দেন।
আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকের লক্ষ্য
পাঁচ বছর বয়সে নাবিলের যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং আজ সে অনেকের কাছে এক বিরল আদর্শ হয়ে উঠেছে। তার ঝুলিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি জাতীয় পদক, উত্তর প্রদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রেও সে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু তার স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই।
এই তরুণী ক্রীড়াবিদ এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের জন্য স্বর্ণপদক জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের অটল বিশ্বাস, বাবার পথনির্দেশনা, মায়ের ভালোবাসা এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমের ফলে নাবিলা খান আজ লক্ষ লক্ষ কিশোর-কিশোরীর কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।