কুমারটুলির প্রতিমা বিশ্ব মানচিত্রের প্রায় সব কটি মহাদেশেই পৌঁছে গেছে, বলছেন শিল্পীরা!

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
কুমারটুলির প্রতিমা বিশ্ব মানচিত্রের প্রায় সব কটি মহাদেশেই পৌঁছে গেছে, বলছেন শিল্পীরা!
কুমারটুলির প্রতিমা বিশ্ব মানচিত্রের প্রায় সব কটি মহাদেশেই পৌঁছে গেছে, বলছেন শিল্পীরা!
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
 
চলতি বছর থেকে কুমারটুলির মা দুর্গা প্রতিমা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমারটুলি থেকে ৩০০-রও বেশি প্রতিমা পাড়ি দিচ্ছে দূর বিদেশে। ইউনেস্কোর হেরিটেজ স্বীকৃতির পর থেকে বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাঙালি ও আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার দুর্গাপূজার চাহিদা প্রতি বছরই রেকর্ড ভাঙছে। 
 
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ২৪০টির রেকর্ড ভেঙে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ৩০০ পার করেছিল, আর ২০২৬ সালেও সেই ধারা বজায় রেখে ৩০০-র বেশি ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছে।
 
ছোট এক চলার দুর্গা প্রতিমা মূর্তি
 
কুমারটুলির প্রখ্যাত মৃৎশিল্পীদের স্টুডিও থেকে পাওয়া তথ্য এবং সামগ্রিক রফতানির পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
 
চলতি বছরে কুমারটুলির প্রতিমা বিশ্ব মানচিত্রের প্রায় সবকটি মহাদেশেই পৌঁছে গেছে। প্রধান প্রধান গন্তব্যগুলি হলো:

** আমেরিকা: প্রতি বছরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রতিমার বরাত এসেছে আমেরিকা থেকে। প্রবীণ শিল্পী হরেরাম পাল ও মিন্টু পালের মতো নামী কারিগররা জানান, শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মশালা থেকেই যথাক্রমে ২০টি করে প্রতিমার অর্ডার মিলেছে, যার মধ্যে ৬টি প্রতিমা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো বড় শহরের পুজো কমিটিগুলোর জন্য ৫ ফুটের বিশেষ ফায়ারপ্রুফ ফাইবার প্রতিমা জুলাই মাসের শুরুতেই জাহাজে রওনা দিয়েছে।
 
** ইউরোপ: যুক্তরাজ্য (লন্ডন), ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং পোল্যান্ডের মতো দেশে এবার বহু প্রতিমা গেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে ফাইবার গ্লাসের প্রতিমার বিশেষ রফতানি হয়েছে এবার।
 
**অন্যান্য দেশ: অস্ট্রেলিয়া, কানাডা (টরন্টো), জাপান, নিউজিল্যান্ড, উগান্ডা এবং দুবাইতেও কুমারটুলির প্রতিমা পাঠানো হয়েছে।
 
ফাইবার গ্লাসের আধিপত্য ও বাজার মূল্য
 
বিদেশে সাধারণত সাবেকি মাটির প্রতিমার বদলে ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা পাঠানোর চল বেশি। এর কারণ হলো ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা ওজনে খুবই হালকা, সহজে নষ্ট হয় না এবং সমুদ্র বা আকাশপথে দীর্ঘ যাত্রার ধকল সহ্য করতে পারে। 
 
প্রতিমা শিল্পী -গোরাচাঁদ পাল অ্যান্ড সন্স
 
২০২৬ সালের বাজার দর ও পরিবহন খরচ:
 
** কুমারটুলিতে তৈরি হওয়া ঘরোয়া বা ছোট আকারের (৩-৪ ফুট) ফাইবার প্রতিমার দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ৪৫,০০০ টাকা থেকে। তবে বড় বারোয়ারি পূজার জন্য ৫ থেকে ১০ ফুটের ভালো মানের সাবেকি সাজের প্রতিমার দাম ১.৫ লক্ষ থেকে ৩.৫ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি পর্যন্ত উঠেছে।
 
শিল্পীদের মতে, বিদেশে প্রতিমা পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতায়াত ও প্যাকেজিংয়ের খরচ প্রতিমার মূল দামের প্রায় সমান বা তার চেয়ে বেশি হয়। যদি একটি প্রতিমার দাম ২ লক্ষ টাকা হয়, তবে কার্গো বা জাহাজের লজিস্টিকস খরচ মিলিয়ে মোট বাজেট ৪ লক্ষ টাকা ছুঁয়ে যায়।
 
বিদেশে প্রতিমা পাঠানোর কাজ কিন্তু পুজোর ঠিক আগে হয় না। সাধারণত দূরবর্তী দেশগুলোতে পৌঁছাতে ৮০ থেকে ৯০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগে। ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যেই বেশিরভাগ রফতানিযোগ্য প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে প্যাকিং ও শিপিংয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে (১৭ অক্টোবর ২০২৬ থেকে মহাষষ্ঠী) বিদেশে সময়মতো মায়ের বোধন শুরু হতে পারে।
 
২০২৬ দুর্গা প্রতিভা বিদেশে বেশি রপ্তানি হওয়ায় শিল্পীরা কি উপকৃত হবেন, কি বলছেন শিল্পীরা?
 
কুমারটুলির অলিগলিতে আজও রাখাল পাল, শ্যামল পাল, প্রদ্যুৎ পাল, নেপাল পাল(পুরুষ শিল্পী), চায়না পাল ও মালা পাল(মহিলা শিল্পী)এর মতো অভিজ্ঞ শিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁরা বলছেন- হ্যাঁ, ২০২৬ সালে বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে দুর্গা প্রতিমার বরাত আসায় এবং রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন এবং ব্যবসায়িক উন্নতির মুখ দেখছেন। ইউনেস্কোর হেরিটেজ স্বীকৃতির পর থেকে বিশ্বজুড়ে দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার সরাসরি সুফল পাচ্ছেন কারিগররা।
 
বিদেশে যাচ্ছে এই ধরনের ফাইবারের প্রতিমা
 
কুমোরটুলির প্রবীণ মৃৎশিল্পী এবং কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতি-র সম্পাদক বাবু পাল বিদেশে প্রতিমা রপ্তানি এবং সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা জানিয়েছেন:
 
১) আগে শুধুমাত্র দুর্গাপ্রতিমাই বেশি বিদেশে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে দুর্গার পাশাপাশি অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিমাও প্রচুর পরিমাণে বিদেশে যাচ্ছে। 
 
২) আগে পুজোর অফ-সিজন বা মরসুম ছাড়া অন্য সময়ে মৃৎশিল্পীরা বসে থাকতেন। কিন্তু এখন বিদেশের বাজারের এই ভালো চাহিদার কারণে শিল্পীরা সারা বছরই কাজের মধ্যে থাকছেন এবং এর ফলে তাঁদের ভালো দু-পয়সা আর্থিক উপার্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা কুমোরটুলির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।
 
৩) ফাইবারের প্রতিমার পাশাপাশি এখন কিছু ক্ষেত্রে মাটির প্রতিমাও দুর্লভভাবে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। বিদেশে সাধারণত ফাইবারের প্রতিমা গেলেও মাটির প্রতিমা যাওয়া অনন্য ও নজিরবিহীন ঘটনা।
 
৪) বিদেশের পুজোর অর্ডারের ক্ষেত্রে সাধারণত পুজো শুরু হওয়ার প্রায় ৬ মাস আগে প্রবাসী বাঙালি বা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টরা অর্ডার দিয়ে দেন। ফলে ঘরোয়া রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির আঁচ পড়ার আগেই প্রতিমাগুলো নিখুঁতভাবে তৈরি ও প্যাক করে জলপথ বা আকাশপথে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
 
বিদেশি বাজারের এই রমরমা নিয়ে সব শিল্পীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তারা  বলছেন, একদিকে যেমন আনন্দের হাওয়া আছে, অন্যদিকে তেমনি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
 
মৃৎশিল্পী বাবু পালের মতে, বিশ্বজুড়ে দুর্গাপূজা এখন দারুণ সাড়ম্বরে উদযাপিত হচ্ছে, যার ফলে আমাদের ব্যবসাও খুব ভালো চলছে। বিদেশে রপ্তানি বাড়ায় করোনা বা মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে কারিগররা আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে শিল্পীরা লাভের মুখ দেখলেও শিল্পীদের একাংশ কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে চিন্তিত। গঙ্গার মাটি, সুতলি,বাঁশ ও খড়ের দাম গত কয়েক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পাশাপাশি এ বছর কিছুটা শ্রমিকের ঘাটতি থাকায় দ্বিগুণ শিফটে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। এই ব্যাপারটাই এখন কুমারটুলির শিল্পীদের ভাবিয়ে তুলেছে।


শেহতীয়া খবৰ