পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যেন মাথা তুলল মানবিকতা। বৃহন্নলাদের দল যা করল তাতে কোন প্রশংসাই যথেষ্ট নয়, বলছেন নাগরিক সমাজ। কখনও ট্রাফিক সিগন্যালে, কখনও বা চলন্ত ট্রেনে শুভকামনা জানানোর বিনিময়ে পেট চলে তাঁদের। সমাজে বৃহন্নলা বা কিন্নর সম্প্রদায়ের রোজগার ও তাঁদের জীবনযাপন নিয়ে এমনই কিছু বাঁধাধরা ধারণা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
সমাজে তাদের নিয়ে গড়ে ওঠা সেই সব সংস্কার ও চেনা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সরিয়ে ফেলে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের কিন্নর সমাজের সদস্যরা এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। অসমের ভয়াবহ বন্যায় গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আর্থিক সাহায্য করলেন। অসমের অসহায় মানুষদের একটু সাহায্য করতে তাঁদের বাড়িয়ে দেওয়া সহায়তার হাত এখন বালুরঘাট শহর জুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।
অসমে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে প্রবল বন্যায় প্রাণ গিয়েছে বহু মানুষের, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায়ের মতো খোলা আকাশের নীচে ঠাঁই নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ দুর্গত অসমেরবাসী। বন্যায় সব হারানো সেই বিপন্ন মানুষগুলোর কষ্ট যেন নাড়া দিয়েছে বালুরঘাটের সৃজনীপাড়া এলাকার কিন্নর সমাজকে।
বালুরঘাটের কিন্নর সমাজের গুরুমার বিশেষ উদ্যোগে দুর্যোগকবলিত সেইসব মানুষদের সাহায্য করতে সংগ্রহ করা হয়েছে নগদ ২ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি ৩০০টি নতুন শাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের গুরুমার মাধ্যমে সাহায্যের সমস্ত অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া নিয়েছেন বৃহন্নলারা।
বালুরঘাটের কিন্নর সমাজের সদস্যরা
বালুরঘাটের এই কিন্নর সমাজের সদস্যরা জানালেন, মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে পারাটাই তো আসল ধর্ম। সামাজিক পরিচয় যাইহোক না কেন বড় কথা হল আমরা মানুষ, তাই অসমের মানুষের এই বিপদে হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব হয়নি আমাদের। সমাজের সবস্তরের মানুষের সহযোগিতাতেই দুর্গতদের জন্য এই অর্থ ও বস্ত্র সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। তাঁরা আশা করছেন, আসাম প্রশাসন তাঁদের পাঠানো এই সামান্য উপহার সানন্দে গ্রহণ করে দুর্গত মানুষের কাজে লাগাবে।
বৃহন্নলাদের এই মহতী উদ্যোগকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বালুরঘাটের বিধায়ক বিদ্যুৎ কুমার রায়। তিনি আবেগপ্রবন হয়ে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে থাকা দুর্গতদের এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে কিন্নর সমাজের এমন সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তাঁদের এই মানবিক ভাবমূর্তি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে। সমাজের প্রয়োজনে এই ধরনের উদ্যোগ সবসময় অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বালুরঘাটের কিন্নর সমাজের সদস্যরা
সংকটের দিনে জাত, পাত বা সামাজিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে বালুরঘাটের বৃহন্নলারা বোঝালেন, অসময়ে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় মানবিক কাজ আর হয় না। শহরের সৃজনীপাড়ার এই ব্যতিক্রমী প্রয়াস আজ বার্তা দিল, মনের মধ্যে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা থাকলে যে কেউ সমাজের আশ্রয়দাতা হয়ে উঠতে পারে।