এভারেস্টের ‘গ্রিন বুটস’-এর ৩০ বছরের রহস্য ভাঙল, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল ভারতীয় পর্বতারোহী দোরজে মোরুপের পরিচয়
আওয়াজ দ্য ভয়েস
প্রায় তিন দশক ধরে মাউন্ট এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’-এ নিঃশব্দে পড়ে থাকা এক হিমায়িত দেহ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্বতারোহীদের কাছে সেটি ছিল ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত একটি স্থায়ী ল্যান্ডমার্ক। কিন্তু সেই দেহের প্রকৃত পরিচয় এতদিন অজানাই ছিল। অবশেষে দীর্ঘদিনের সেই রহস্যের অবসান ঘটিয়েছে ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে, ‘গ্রিন বুটস’ আসলে ১৯৯৬ সালে এভারেস্ট অভিযানে নিখোঁজ হওয়া ভারতীয় পর্বতারোহী দোরজে মোরুপের হিমায়িত দেহাবশেষ।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৯,০৩২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট শুধু পর্বতারোহীদের স্বপ্নের গন্তব্যই নয়, একই সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিরও অন্যতম ভয়ঙ্কর প্রতীক। বিশেষ করে ২৬ হাজার ফুটের উপরের অংশ, যা ‘ডেথ জোন’ নামে পরিচিত, সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। এই উচ্চতায় মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। হাইপোক্সিয়া, সেরিব্রাল এডিমা ও পালমোনারি এডিমার মতো প্রাণঘাতী শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। এই কারণেই সুইস চিকিৎসক ও পর্বতারোহী এডুয়ার্ড উইস-ডুনান্ট বহু বছর আগে ওই অঞ্চলকে ‘ডেথ জোন’ নামে অভিহিত করেছিলেন।
এই বিপজ্জনক পথেই ১৯৯৬ সাল থেকে বরফে ঢাকা অবস্থায় পড়ে ছিল সবুজ রঙের বুট পরা এক পর্বতারোহীর দেহ। সময়ের সঙ্গে সেটিই ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এভারেস্টে ওঠা ও নামার পথে অসংখ্য অভিযাত্রী সেই দেহ দেখে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতেন এবং দ্রুত এলাকা পার হওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে দেহটির পরিচয় নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও নিশ্চিত তথ্য কখনও সামনে আসেনি।
সম্প্রতি আইটিবিপির একটি বিশেষ পর্বতারোহী দল ওই দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। ডিএনএ-সহ একাধিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার পর জানা যায়, সেটি ভারতীয় পর্বতারোহী দোরজে মোরুপের দেহাবশেষ। ১৯৯৬ সালে এভারেস্ট অভিযানের সময় তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং আর ফিরে আসেননি।
আইটিবিপি সূত্রের খবর, এভারেস্ট থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অত্যন্ত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত পর্বতারোহীদের দেহ সেখানেই থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বরফ ও তুষারের নিচে চাপা পড়ে থাকা এই দেহগুলিকে উদ্ধার করার উদ্যোগ খুব কম ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়।
তবে দোরজে মোরুপের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর দেহ ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু করেছে আইটিবিপি। উদ্ধার অভিযানের জন্য ছয়জন অভিজ্ঞ শেরপাকে নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে দেহটি কাঠমান্ডুতে নামিয়ে আনা হবে। এরপর ভারতে আনার আগে তিব্বতে কর্মরত চিনা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হবে।
আইটিবিপির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এই প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সব অনুমোদন মিললে বহু বছর ধরে এভারেস্টের বরফে নিঃশব্দে পড়ে থাকা দোরজে মোরুপের দেহ অবশেষে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের স্বপ্ন এখনও হাজার হাজার পর্বতারোহীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যে কতটা নির্মম, ‘গ্রিন বুটস’-এর পরিচয় প্রকাশ তারই আর এক মর্মস্পর্শী স্মারক হয়ে রইল।