চোখে দেখেন না, আঙুলের ছোঁয়ায় গড়েন দেবী দুর্গা! মাটির বুকে প্রাণের স্পর্শ দৃষ্টিহীন শিল্পী রাম পালের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
চোখে দেখেন না, আঙুলের ছোঁয়ায় গড়েন দেবী দুর্গা! মাটির বুকে প্রাণের স্পর্শ দৃষ্টিহীন শিল্পী রাম পালের
চোখে দেখেন না, আঙুলের ছোঁয়ায় গড়েন দেবী দুর্গা! মাটির বুকে প্রাণের স্পর্শ দৃষ্টিহীন শিল্পী রাম পালের
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস, বাংলা

দেবীর মুখের বাঁক, চোখের গড়ন কিংবা আঙুলের সূক্ষ্ম কারুকাজ, একজন প্রতিমাশিল্পীর কাছে প্রতিটি খুঁটিনাটি নিখুঁত করে তোলার জন্য দৃষ্টিশক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু জন্ম থেকেই দু’চোখে দৃষ্টিহীন রাম পাল যেন সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। চোখে না দেখেও শুধুমাত্র আঙুলের স্পর্শ, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর মনের মধ্যে গেঁথে থাকা প্রতিমার অবয়বকে অবলম্বন করে তিনি গড়ে তোলেন দেবী দুর্গা ও গণেশের মূর্তি। তাঁর হাতে মাটির কাঠামো শুধু প্রতিমার রূপ পায় না, যেন ফুটে ওঠে এক গভীর অনুভব, বিশ্বাস আর শিল্পসাধনার গল্প।
 
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি রাম পালের এই অসাধারণ শিল্পসাধনার সাক্ষী উত্তরপ্রদেশের বস্তি জেলার বাবুরহাওয়া গ্রাম। গত প্রায় ২৫ বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতি বছর এই গ্রামে আসেন তিনি। দুর্গাপুজো ও অন্যান্য উৎসবের মরশুমে প্রতিমা তৈরির জন্য প্রায় ছ’মাস কাটান ছাওনি এলাকায়। তাঁর তৈরি প্রতিমার নিখুঁত গড়ন ও জীবন্ত অভিব্যক্তি দেখে মুগ্ধ হন স্থানীয় বাসিন্দারা।
 
রাম পাল
 
উৎসবের মরশুমে একের পর এক মাটির কাঠামো তাঁর হাতের স্পর্শে রূপ পেতে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি দুর্গা ও গণেশের প্রতিমা তৈরি করেন তিনি। চোখে না দেখেও প্রতিমার আকৃতি ও অনুপাত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার যে দক্ষতা তিনি অর্জন করেছেন, তার পিছনে রয়েছে বহু বছরের অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর অনুশীলন।
 
নিজের শিল্পসত্তার কথা বলতে গিয়ে রাম পাল বলেন, “প্রতিমা তৈরি করতে আমার চোখের প্রয়োজন হয় না। তাদের রূপ ও অনুপাত আমার মন আর আত্মার মধ্যে আগে থেকেই রয়েছে। ঈশ্বরের আশীর্বাদেই আমি এই কাজ করতে পারি।” তাঁর এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে শিল্পের প্রতি গভীর বিশ্বাস। দৃষ্টিশক্তির অভাব তাঁর কাছে কাজ থামিয়ে দেওয়ার কারণ হয়ে ওঠেনি। বরং নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকেই তিনি পরিণত করেছেন শিল্পের প্রধান অবলম্বনে।
 
রাম পাল কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ। মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে পরিবারের ইতিহাসে। তাঁর বাবা বিনায়ক কৃষ্ণ পাল ছিলেন একজন দক্ষ ভাস্কর। বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতেই প্রতিমা তৈরির নানা কৌশল আয়ত্ত করেন রাম পাল। কীভাবে মাটিকে নির্দিষ্ট আকার দিতে হয়, কীভাবে একটি অবয়বকে ধীরে ধীরে পূর্ণতা দিতে হয়, সেই শিক্ষা পেয়েছেন হাতে-কলমে।
 
বাবার কাছ থেকে শেখা শিল্প আজও নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই কাজ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকা ও ঐতিহ্যেরও অংশ। রাম পালের ভাই সঞ্জয় পালও জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন ছিলেন এবং তিনিও প্রতিমা তৈরির কাজ করতেন। কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। রাম পালের কথায়, তিনি, তাঁর বাবা এবং ভাই, তিনজনই জন্মগতভাবে দৃষ্টিহীন ছিলেন। একসময় সঞ্জয়ও প্রতিমা তৈরির কাজে তাঁকে সহযোগিতা করতেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পরিবারের একাধিক সদস্যের এই শিল্পসাধনা তাঁদের অসাধারণ অধ্যবসায়ের পরিচয় বহন করে।
 
 
রাম পালের পরিবারের জীবন আবর্তিত হয় মাটি আর শিল্পকে ঘিরেই। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর প্রায় ছ’মাস আগে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাবুরহাওয়ায় আসেন। উৎসবের মরশুমে দুর্গা ও গণেশের প্রতিমা তৈরি করেন। পুজোর মরশুম শেষ হলে তাঁরা আবার ফিরে যান কলকাতায়। বছরের বাকি ছ’মাস সেখানে মাটির বাসনপত্র, খেলনা এবং নানা ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করে সংসার চালান।
 
এই কাজে রাম পালের স্ত্রী কাঞ্চন পালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বামীর পাশে থেকে প্রতিমা তৈরিতে সাহায্য করেন তিনি। তাঁদের দুই ছেলে, ২২ বছরের সৌরভ পাল এবং ২০ বছরের হৃদয় পাল গ্রামেই থেকে মাটির বাসনপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কাজ করেন। তাঁদের একটি মেয়েও রয়েছে।
 
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের শ্রমে টিকে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্প। তবে দীর্ঘ পরিশ্রম করেও যে আর্থিক স্বচ্ছলতা সব সময় আসে না, রাম পালের জীবন তারও উদাহরণ। প্রতিমা তৈরিই পরিবারের প্রধান জীবিকা। কিন্তু সেই কাজ থেকে পাওয়া উপার্জন দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এই বাস্তবতা নিয়ে রাম পালের বক্তব্য, “পরিশ্রম আর ভক্তি বিক্রি করা যায় না।” কথাটির মধ্যে যেমন রয়েছে শিল্পীর আত্মমর্যাদা, তেমনই রয়েছে শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।
 
রাম পালের তৈরি প্রতিমাগুলির ক্ষেত্রেও মাটির অবয়বকে সম্পূর্ণ করে তোলার জন্য রঙের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমায় চূড়ান্ত রূপ দিতে তিনি এশিয়ান পেইন্টসের রং ব্যবহার করেন। তাঁর কাছে প্রতিমা তৈরি কেবল মাটিকে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার কাজ নয়; প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন মনোযোগ, অনুভূতি এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। বাবুরহাওয়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের কাছে তাঁর কাজের তাৎপর্য আরও গভীর। একজন দৃষ্টিহীন শিল্পীর হাতে যখন দেবদেবীর প্রতিমা এমন নিখুঁতভাবে গড়ে ওঠে, তখন তাঁদের মনে জন্ম নেয় বিস্ময় ও শ্রদ্ধা। রাম পাল বলেন, “মানুষ আমার তৈরি প্রতিমা আধ্যাত্মিক অনুভূতি নিয়ে দেখেন। তাঁদের বিশ্বাস, যে মানুষ দেখতে পান না, তাঁর পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব কেবল মনের চোখ দিয়েই।”
 
 
রাম পালের অসাধারণ শিল্পকর্ম একসময় বৃহত্তর পরিসরেও পরিচিতি লাভ করে। ২০২০ সালে এশিয়ান পেইন্টস তাঁকে ‘শারদ সম্মান’ প্রদান করে। তাঁর শিল্পসাধনা ও ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যচিত্রও তৈরি হয়, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শকের কাছে পৌঁছে যায় তাঁর কাজের কথা। এই স্বীকৃতি তাঁর শিল্পকে নতুন পরিচিতি দিলেও জীবনের মূল লড়াই বদলে যায়নি। পরিবারের ভরণপোষণ, নিয়মিত কাজ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিল্পকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এখনও তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরস্কার ও প্রশংসার পাশাপাশি তাঁকে সামলাতে হয় সীমিত উপার্জনের বাস্তবতাও।
 
তবু নিজের কাজ থেকে সরে আসেননি রাম পাল। প্রতি বছর মাটির কাছে ফিরে আসেন তিনি। আঙুলের স্পর্শে অনুভব করেন প্রতিমার অবয়ব, অভিজ্ঞতার সাহায্যে ফুটিয়ে তোলেন তার সূক্ষ্মতা। এভাবেই নিজের বাবার কাছ থেকে শেখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। 
 
রাম পালের জীবন মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভার পরিচয় কেবল শারীরিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে না। চোখ দিয়ে দেখা যায় কোনও অবয়ব, কিন্তু তাকে অনুভব করতে প্রয়োজন অন্য এক উপলব্ধি। যে মানুষ পৃথিবীর রং নিজের চোখে দেখতে পান না, তিনিই যখন মাটির প্রতিমায় রঙের ছোঁয়া দিয়ে দেবদেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলেন, তখন তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মাটির প্রতিটি রেখায়, প্রতিমার প্রতিটি বাঁকে যেন লুকিয়ে থাকে রাম পালের দীর্ঘ সাধনার গল্প। তাঁর আঙুলের স্পর্শে তৈরি প্রতিমা তাই শুধু উৎসবের উপকরণ নয়, সেগুলি এমন এক শিল্পীর পরিচয় বহন করে, যিনি চোখের দৃষ্টির সীমা পেরিয়ে নিজের অনুভূতিকেই করে তুলেছেন সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি।


শেহতীয়া খবৰ