দু’হাতের অভয়া দুর্গা, শিবপুরের পালবাড়িতে ৩৫০ বছরের ঐতিহ্য, আজও হয় মহিষ বলি

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
হাওড়ার শিবপুরের দু’হাতের অভয়া দুর্গা, যেখানে আজও রয়েছে মহিষ বলির প্রথা
হাওড়ার শিবপুরের দু’হাতের অভয়া দুর্গা, যেখানে আজও রয়েছে মহিষ বলির প্রথা
 
শান্তি প্রিয় রায়চৌধুরী

বাংলার ইতিউতি লুকিয়ে আছে বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর নানান ইতিহাস। বনেদি পুজো মানেই সেখানে জড়িয়ে আছে পুরনো ঐতিহ্যের অনেক কথা। কিন্তু বর্তমান যুগে এসে থিমের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বনেদি বাড়ির সব দুর্গা পুজো। তবু আজও বনেদি বাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্যময় ইতিহাসগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বিভিন্ন পরিবারের বংশধরেরা। বনেদি বাড়ির ঠাকুর দালানে কখনও তিনি মহিষাসুরদলনী আবার কখনও তিনি অভয়দায়িনী। দেবীর অভয়া রূপের কথা বললে প্রথমেই হাওড়ার যে বনেদি বাড়ির নাম চলে আসে তা হল শিবপুরের বট কৃষ্ণ পাল বাড়ির দুর্গাপূজার কথা। 

এই বাড়ির ৩৫০ বছরের দুর্গাপুজো সবচেয়ে বেশি খ্যাতিমান ও জৌলুস লাভ করেছে ওই বংশেরই সন্তান এককালের ভারত বিখ্যাত ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা বটকৃষ্ণ পালের আমলে। চলুন জেনে নিই প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাল বাড়ির পুজোর বনেদিয়ানার কথা।
 
বটকৃষ্ণ পাল পরিবারের ঠাকুর দালান
 
অতীতের একটা রথযাত্রার দিন পালবাড়ির ঠাকুর দালানে বহু শতাব্দী প্রাচীন দেবী দুর্গার কাঠামোটিকে পুজোর মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় মূর্তি গড়ার কাজ। ডাকের সাজে ধীরে ধীরে সুশোভিত হয়েছিল মায়ের মূর্তিটি। সে কী সাজসজ্জা!
 
এই বাড়ির দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেবীর রূপ। তার মাত্র দুটি হাত। একটি হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গি, অন্য হাতে রয়েছে পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মের সঙ্গে ফল। দেবীর সঙ্গে মহিষাসুর নেই। সিংহবাহিনী এই দিভুজা দেব মূর্তি বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গা পূজার মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
 
কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে চণ্ডী পাঠের মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় পুজো, চলে দুর্গা নবমী পর্যন্ত। এখানে পুজো হয় শাক্ত মতে। নবপত্রিকা স্নানেও রয়েছে নিজস্ব রীতি। বাড়িতেই নবপত্রিকা স্নান করানো হয়, সন্ধিপূজো তান্ত্রিক রীতিতে করা হয়। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ান বাড়ির মহিলারা। শুধু বাড়ির মহিলা নয় প্রতিবেশী মহিলারাও এতে অংশ নেন।
 
দুহাতের অভয়া দূর্গা
 
উৎসবের আবহে মেতে ওঠে বহু শতকের এই প্রাচীন বনেদি বাড়ি। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি বোধনের দিন থেকে নবমী পর্যন্ত টানা ১৫ দিন ধরে চলে চণ্ডীপাঠ। পাল বাড়ির পুজোর এরকমই বিশেষ কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে। অন্নভোগের বদলে লুচি, মিষ্টি, ফলের মাধ্যমেই ভোগ দেওয়া হয় দেবীকে। সপ্তমীর দিন বাড়ির ঠাকুর দালানেই নবপত্রিকার স্নান করানো হয়। রীতিমতো সাড়ম্বরের সঙ্গে পুজোর তিন দিন অর্থাৎ সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে পাঠাবলি, ফলবলি এবং মোষ বলিও হয় পাল বাড়িতে। 
 
মহিষ বলি নিয়ে রয়েছে একটি কাহিনী। শিবপুরের রায় চৌধুরী বাড়ির দুর্গা পূজার মহিষ বলি দেওয়ার প্রথা ছিল আছে। কোন এক পুজোয় হাঁড়িকাঠ নিয়ে মহিষ গিয়ে পালবাড়ির দোর গড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর থেকেই মহিষ বলি দেওয়ার প্রথা চালু হয়। প্রথা অনুযায়ী বাড়ির গৃহিণীদের অনুপস্থিতিতে সন্ধিপুজো সম্পন্ন করেন বাড়ির ছেলেরাই। আগে কামান শব্দ শুনে তারপরই শুভারম্ভ হতো এই সন্ধিপুজোর। 
 
কাঠামো পুজো থেকে বিসর্জন, নবপত্রিকার স্নান থেকে ধুনো পোড়ানো, প্রতিটি রীতির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বহু প্রজন্মের স্মৃতি। আজকে বর্তমান প্রজন্মের দিনে  বাড়িটি তাই হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত ইতিহাসের দলিল। ৩৮, নবগোপাল মুখার্জি লেনের এই বাড়ি বটকৃষ্ণ পালের আদি বাড়ি হিসেবে পরিচিত। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন।
 
বটকৃষ্ণ পালের বাড়ি
 
পুজোর বয়স প্রায় সাড়ে তিনশো বছর বা তারও বেশি বলে মনে করা হয়। তবে পুজোটি ঠিক কত সালে শুরু হয়েছিল, তার কোনও প্রমাণ সেভাবে পাওয়া যায় নি। এই পুজোর সঙ্গে পাল পরিবারের পূর্বপুরুষ সর্বেস্বর পালের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর সময় থেকেই এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরে বটকৃষ্ণ পালের সময়ে পুজোর পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়। কথিত আছে, এই দেবী অসুরবিনাশী নন। তিনি অভয়া। ভক্তের ভয় হরণকারী মায়ের রূপ। কুমোরটুলির শিল্পীরা বংশপরম্পরায় এই বাড়ির প্রতিমা গড়ে আসছেন। শুধু মৃৎশিল্পী নন, ঢাকিরাও বংশ পরম্পরায় এখানে ঢাক বাজাচ্ছেন।
 
দশমীতে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন বাড়ির মহিলারা। বিসর্জনের দিন পরিবারের সদস্যরা দেবীর প্রতিমা কাঁধে নিয়ে গঙ্গার ঘাটে যেতেন বলে উল্লেখ রয়েছে। বটকৃষ্ণ পাল পরে কলকাতা শোভাবাজারে নিজের মামাবাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই দুর্গাপুজোর পরিবর্তে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। আর শিবপুরের আদি বাড়িতে দুর্গাপুজো ঐতিহ্য ও পরম্পরায় আজও চলছে। জৌলুস কমলেও ঐতিহ্যে আপস করেনি পাল পরিবার। আজ শিবপুরের এই বাড়ির পরিচয় শুধু বটকৃষ্ণ পালের জন্মভিটে হিসেবে নয়, অভয়া দুর্গার ঠিকানা হিসেবেও।


শেহতীয়া খবৰ