৮৮-তে ৫৯ বছরের প্রেমের অসাধারণ নিদর্শন! স্ত্রীর গালে টোল ফুটে ওঠা হাসি মূর্তিতে ‘অমর’ করে ‘ভালোবাসা’-র বার্তা ছড়ালেন শিক্ষক
তরুণ নন্দী / কলকাতা
স্ত্রীর হারানো হাসি ফিরিয়ে আনতে অভিনব উদ্যোগ ৮৮ বছরের শিক্ষকের। স্ত্রীর দু-গালে টোল পরা মূর্তিতে বাঁচিয়ে রাখলেন ৫৯ বছরের ভালোবাসা। যে হাসির প্রেমে একদিন তিনি পড়েছিলেন, বয়সের ভার আর অসুস্থতায় আজ সেই হাসিই হারিয়ে গেছে। বিছানায় শয্যাশায়ী স্ত্রী আর কবে আগের মতো হেসে উঠবেন জানেন না ৮৮ বছরের স্বামী ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। তাই স্মৃতিকে ধরে রাখলেন নিজের হাতের তৈরি মূর্তিতে। স্ত্রীর সেই হাসিটুকু চিরকাল ধরে রাখতে চাইলেন মধ্যমগ্রামের এই প্রাক্তন শিক্ষক।
দাম্পত্যের পথচলার বয়স প্রায় ছদশকের। ৫৯ বছরের এই সংসার জীবনে কত কিনা ঘটেছে। সন্তানদের বড় করা থেকে জীবনের নানা কঠিন সময় পরিয়ে আসা, সবকিছুর সাক্ষী রয়েছে অঞ্জলি ও ভূপতির সংসার। কিন্তু এত বছরের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতির ভিড়েও স্বামী ভূপতির মনে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে স্ত্রী অঞ্জলির গালে চোল পরা হাসি।
আজও কাঁপা কাঁপা গলায় স্মৃতি আওড়ালেন শিক্ষক। বললেন, অঞ্জলি হাসলেই ঠোঁটের দুপাশে ফুটে উঠত ছোট্ট দুটো টোল। সেই হাসিই নাকি তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে দিয়েছিল। দুজেনের সাংসারিক জীবনে নানা ওঠাপড়ায় কেটে গিয়েছে কয়েক দশক। আজ নানা অসুখে জর্জরিত হয়ে গত ছমাস ধরে শয্যাশায়ী হয়েছেন অঞ্জলিদেবী। শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না, ফলে মুখেও নেই সেই চেনা হাসি। তবুও স্বামী ভূপতির মনে এখনও একেবারে স্পষ্ট অঞ্জলির গালে টোল পরা সেই হাসি।
এবার স্মৃতিকেই যেন ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। নিজের হাতে তৈরি করেছেন স্ত্রীর হাসিমুখের একটি মূর্তি। প্লাস্টার অফ প্যারিসে তৈরি সেই মূর্তিতে অঞ্জলির আয়ত চোখ, টিকালো নাক, পরিপাটি চুলের পাশাপাশি সবচেয়ে যত্ন করে ফুটিয়ে তুলেছেন ঠোঁটের দু’পাশের সেই ছোট্ট টোল।
ভূপতিরঞ্জন দেবনাথের তৈরি তাঁর স্ত্রীর মূর্তি
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত মধ্যমগ্রাম হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক ভূপতিরঞ্জনের শিল্পচর্চা নিয়ে এমনিতেই সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের মূর্তি ও শিল্পকর্ম তৈরি করে আসছেন। মাটি, নারকেলের খোল, গাছের ডাল সহ ফেলে দেওয়া সাধারণ উপকরণ থেকেও তিনি শিল্পসৃষ্টি করেছেন। শিক্ষকের বাড়ির ঘরে ঘরে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে তাঁর তৈরি নানা শিল্পকর্মের নানান ধরণ। তবে অঞ্জলির মূর্তিটি তাঁর কাছে শিল্পের পাশাপাশি তাঁর জীবনের ৫৯ বছরের সঙ্গীর স্মৃতি।
করোনার সময়ে ছেলেকে হারিয়েছেন ভূপতি। এখন পেনশনের টাকাতেই সংসার চলে। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তবু এসবের মাঝেও ভূপতি স্যারের ঘরের শোকেসে হাসছেন অঞ্জলি। সন্ধ্যা নামলে অনেক সময়ই সেই মূর্তির সামনে গিয়ে চুপ করে বসে থাকেন ভূপতি। হয়তো চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু বছর আগের সেই দিনগুলি।
ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ ও তাঁর স্ত্রীর একটি পুরোনো ছবি
মানুষের শরীর একদিন তাঁর সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরতি নেয়। কারণ, সময়ও কাউকে ফিরে আসতে দেয় না। কিন্তু ভালোবাসা স্মৃতির মধ্যে নিজের জন্য একটি জায়গা ঠিকই বানিয়ে নেয়। ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ সেই জায়গাটুকুই তৈরি করে রেখেছেন স্ত্রীর একটি হাসি মুখের মূর্তির মধ্যে। তিনি যেন লিখে গেলেন, ৫৯ বছরের এক অমলিন ভালোবাসার কথা।