অসমের বরাক উপত্যকা থেকে জাতীয় মঞ্চে: পিক্সির কসপ্লে অভিযাত্রা

Story by  Satananda Bhattacharjee | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
‘পিক্সি’ (প্রিয়ঙ্করী নাথ)
‘পিক্সি’ (প্রিয়ঙ্করী নাথ)
 
শতানন্দ ভট্টাচার্য 

যে সময়ে কসপ্লে আর নিছক অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এক বহুমাত্রিক শিল্পরূপ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে, সেই সময়েই অসমের এক তরুণী জাতীয় মঞ্চে তৈরি করছেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়। ‘পিক্সি’ (আসল নাম প্রিয়ঙ্করী নাথ) ধিরে ধিরে উঠে আসছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মাল্টিমিডিয়া শিল্পী হিসেবে। পোশাক নির্মাণ, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং এবং পারফরম্যান্স-এই তিনের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে তুলেছেন নিজের সৃজনশীল জগৎ।
 
দক্ষিণ অসমের  বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলার লালা শহরে পিতৃপুরুষের মুল বাড়ি থাকলেও বর্তমানে তাঁরা শিলচরের বাসিন্দা। মা মনিকঙ্কনা ও বাবা পিকলু নাথের অনুপ্রেরণায় পিক্সি প্রতিনিধিত্ব করছেন নতুন প্রজন্মের ভারতীয় কসপ্লেয়ারদের, যারা এই শিল্পকে এক উচ্চস্তরে নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে শুরু হলেও, আজ তা রূপ নিয়েছে আত্মপ্রকাশ ও উদ্ভাবনের এক অনন্য যাত্রায়, যা অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে গোটা অঞ্চলের তরুণদের।
 
পিক্সির কাছে সৃজনশীলতা শুধুই শখ নয়, বরং বিশ্বকে দেখার এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন ক্যামেরা সময়কে স্থির করে রাখে, তেমনই তাঁর আঁকা ও ডিজাইন বন্দি করে আবেগ ও গল্পকে। সেই থেকেই কসপ্লের প্রতি ঝোঁক, যেখানে নিজের আঁকা চরিত্রগুলোকেই তিনি জীবন্ত করে তোলেন মঞ্চে, কল্পনাকে পরিণত করেন বাস্তব অভিজ্ঞতায়।
 
২০১৯ সালে, মাধ্যমিকের পরপরই তাঁর এই যাত্রার সূচনা। কোভিড-১৯ অতিমারির সময় যখন বিশ্ব স্তব্ধ, তখনই ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। ট্রান্সফরমেশন মেকআপ দিয়ে শুরু, এরপর ফেস পেইন্টিং, ধিরে ধিরে নিজের দক্ষতায় শান দেন তিনি।
 
ডিজিটাল শিল্পী গওক্স ও ভেক্স-এর কাজ থেকে প্রভাবিত হয়ে ডুডল আর্টেও নিজস্ব ধারা গড়ে তোলেন। জাতীয় স্বীকৃতির আগে ছোট ছোট স্থানীয় মঞ্চেই নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন পিক্সি। পোশাক তৈরি, প্রপ বানানো, মঞ্চে অভিনয়, সবকিছুর মধ্যেই চলেছে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর বড় সাফল্যের ভিত গড়ে দেয়। ২০২৫ সালে গুয়াহাটির কমিক কন -এ তাঁর বড় সাফল্য আসে। ভিএফএক্স ও প্রপ মেকিং বিভাগে আইসিসি অ্যাওয়ার্ড  জিতে নেন তিনি।
 
তাঁর ‘ফ্র্যাকচার্ড জিনক্স’ কসপ্লে, জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘লিগ অব লেজেন্ডস’ থেকে অনুপ্রাণিত, ছিল নিখুঁত কারিগরি দক্ষতার এক অসাধারণ উদাহরণ। বিশেষভাবে তৈরি মেকানিক্যাল ‘রাইনো গান’, এলইডি আলো, সাউন্ড ইফেক্ট এবং বাস্তবসম্মত টেক্সচার। সব মিলিয়ে সেই কাজ আলাদা করে নজর কেড়েছিল।
 
এরপর ২০২৬ সালে কলকাতা কমিক কন বিশ্ব বাংলা এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত এই বিশাল অনুষ্ঠানে ৩০ হাজারেরও বেশি দর্শকের ভিড় ছিল। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও ‘ট্রিনিটি ব্লাড’-এর চরিত্র এস্থার ব্ল্যাঞ্চেট রূপে মুগ্ধ করেন পিক্সি। সাই-ফাই বিভাগে সেরা সম্মান অর্জন করে তিনি প্রমাণ করে দেন নিজের দক্ষতা, পাশাপাশি জাতীয় স্তরে উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও তুলে ধরেন।
 
পিক্সির প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর কাছে গভীরভাবে ব্যক্তিগত। শুধু সৌন্দর্য নয়, প্রতিটি পোশাকই যেন আত্মবিশ্বাসের লড়াই, সৃজনশীলতার চ্যালেঞ্জ জয়ের গল্প, অধ্যবসায় ও শিল্পের মিলিত প্রতিচ্ছবি। ভারতে কসপ্লে সংস্কৃতি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই পিক্সির মতো শিল্পীরা নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছেন।
 
কারিগরি দক্ষতা, পারফরম্যান্স এবং ডিজিটাল আর্টের নিখুঁত সমন্বয়ে তিনি ফ্যানডমকে পরিণত করছেন এক গভীর শিল্প-প্রকাশে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে কনভেনশন হলের বাইরেও। ইনস্টাগ্রামে @pxyverse (অ্যাট পিএক্সওয়াইভার্স) হ্যান্ডেলে তাঁর কাজ নজর কেড়েছে বহু মানুষের। সেখানেই ধরা পড়ছে এক তরুণ শিল্পীর ক্রমবিকাস, যিনি ভবিষ্যতের ভারতীয় কসপ্লে জগতকে নতুনভাবে গড়ে তুলছেন।