দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে দিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার থেকে শুরু হতে চলা ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় এই কেন্দ্রটিকে আপাতত বাদ রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ, মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে গণনা হবে ২৯৩টি আসনের। ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ক্ষেত্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন, যা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ মে।
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। কমিশন জানিয়েছে, অভিযোগের সংখ্যা, প্রকৃতি এবং গভীরতা বিচার করে এই কেন্দ্রে স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই গণনার পরবর্তী কোনও উপযুক্ত দিনে নয়, বরং নির্দিষ্টভাবে ২১ মে-ই ওই কেন্দ্রের সমস্ত ভোটকেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ২৮০টি ভোটকেন্দ্রেই নতুন করে ভোটগ্রহণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন, কারণ সাধারণত কোনও নির্দিষ্ট বুথ বা সীমিত এলাকায় পুনর্নির্বাচনের ঘটনা ঘটলেও, গোটা বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে পুনরায় ভোটগ্রহণ খুবই বিরল। ফলে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।প্রসঙ্গত, গত ২১ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের আগে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। বিশেষ করে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্বে থাকা অজয় পাল শর্মা-র ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়। ‘সিংঘম’ নামে পরিচিত এই পুলিশ আধিকারিকের সক্রিয় পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
অভিযোগ ওঠে, এলাকার প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর খান ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং ভয় দেখিয়ে ভোট করাতে চাইছেন। সেই প্রেক্ষিতে অজয় পাল শর্মা স্বয়ং জাহাঙ্গীর খানের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সতর্ক করেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে, যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়।ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ আধিকারিক সরাসরি গিয়ে কঠোর ভাষায় সতর্ক করছেন, যাতে কোনওরকম বেআইনি প্রভাব খাটানো না হয়। অনেকেই এই পদক্ষেপকে সাহসী বলে প্রশংসা করলেও, অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক মহল এটিকে প্রশাসনিক সীমা লঙ্ঘনের উদাহরণ বলেও দাবি করে।
এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের জেরে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে। কমিশনের একাধিক পর্যবেক্ষক এবং রিপোর্টের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ফলতা কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণই একমাত্র উপায় যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বজায় থাকে।এদিকে সোমবার থেকে শুরু হতে চলা গণনা ঘিরে উত্তেজনা চরমে। ২৯৩টি বিধানসভা আসনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোবে। তবে ফলতা কেন্দ্রের ফলাফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কমিশনের দৃঢ় অবস্থানকে প্রমাণ করে, তেমনই অন্যদিকে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে চলা বিতর্ককেও সামনে নিয়ে আসে।
সব মিলিয়ে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র এখন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ২১ মে-র পুনর্নির্বাচন এবং তার ফলাফলই নির্ধারণ করবে এই কেন্দ্রের চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমীকরণ।