হিনা কৌসর খান: সাংবাদিকতা ও সংবেদনশীল লেখনীর মাধ্যমে মুসলিম সমাজের অন্তর্জগৎ উন্মোচন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
হিনা কৌসর খান
হিনা কৌসর খান
 
সমীর ডি. শেখ

আজকের দ্রুতগামী ও অস্থির সময়ে সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র তাত্ক্ষণিক খবর আর চটকদার শিরোনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে হিনা কৌসর খান এক ভিন্নধর্মী কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসেন। তিনি কেবল ঘটনাকে তুলে ধরেন না, বরং মানুষের অনুভূতি, সমাজের অন্তর্লীন মানসিকতা এবং বিশেষ করে মুসলিম সমাজের আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে সংবেদনশীলভাবে সামনে আনেন। তাঁর লেখনী পাঠককে শুধু আকৃষ্ট করে না, বরং তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পূর্বধারণা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের লেখার শক্তিতে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য জগতে নিজস্ব জায়গা তৈরি করার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণামূলক।
 
বিজ্ঞান থেকে সাংবাদিকতায় যাত্রা
 
হিনা কৌসর খানের পিতার মূল বাড়ি ইন্দাপুর তালুকার বোরি কাজাল গ্রামে। তবে তিনি পড়াশোনা ও চাকরির জন্য পুনেতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে হিনার শৈশব ও পড়াশোনা পুরোপুরি পুনেতেই, মারাঠি মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (বি.এসসি.) ডিগ্রি অর্জন করেন। যদিও তিনি বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, তাঁর ভেতরে একজন লেখক লুকিয়ে ছিল।
 
হিনা কৌসর খান
 
নিজের শুরুর দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “স্কুল জীবন থেকেই আমি লিখতে ভালোবাসতাম। তাই মনে হতো, যে পেশাই বেছে নিই, তা যেন লেখার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। তখন ঠিক বুঝতাম না কেন এমন মনে হতো, কিন্তু এখন ফিরে তাকিয়ে বুঝি, হয়তো ভয় ছিল, অন্য কোনো পেশায় গেলে লেখাটা হারিয়ে ফেলব।” এই ভাবনা থেকেই বি.এসসি. পড়ার সময় তিনি সাংবাদিকতার কোর্স খুঁজতে শুরু করেন। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রণাডে ইনস্টিটিউটের সাংবাদিকতা কোর্স সম্পর্কে জানতে পেরে সেখানে ভর্তি হন।
 
শিক্ষকতার পারিবারিক ধারা ভেঙে নতুন পথ
 
হিনার পরিবারে রয়েছেন তাঁর বাবা-মা ও তিন বোন। তাঁর বাবা একজন শিক্ষক, আর মা গৃহিণী হলেও উচ্চশিক্ষিত। বাড়ির পরিবেশ ছিল বেশ মুক্তমনা। নিজের বেড়ে ওঠার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যে ধর্মের প্রভাব বেশ প্রবল ছিল, কিন্তু আমাদের বাড়িতে সে রকম কোনো চাপ ছিল না। উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ঐতিহ্য। আমরা এমন পরিবেশে বড় হয়েছি, যেখানে নিজে ভাবার ও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল।”
 
তবে সাংবাদিকতার মতো অনিশ্চিত পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বাবার কিছুটা আপত্তি ছিল। পরিবারে অনেকেই শিক্ষক হওয়ায়, বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েও সেই নিরাপদ পেশাই বেছে নিক। মূল উদ্বেগ ছিল সাংবাদিকতার অনিয়মিত কর্মঘণ্টা নিয়ে। কিন্তু তাঁর শিক্ষিত মা মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, এবং শেষ পর্যন্ত বাবার আপত্তি দূর হয়ে যায়।
 
হিনা কৌসর খান
 
সংবাদ থেকে ফিচার লেখার দিকে ঝোঁক
 
রণাডে ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা শেষ করার মাত্র ৩-৪ মাসের মধ্যেই হিনা ‘লোকমত’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি অনুভব করেন, কঠোর সংবাদ কাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, “সংবাদের জায়গা খুব সীমিত, আর তা তাৎক্ষণিক ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফিচার লেখায় আপনি ঘটনার গভীরে যেতে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারেন। বিভিন্ন মতামত সংগ্রহ করে তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে। তাই আমি ফিচার লেখার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠি।”
 
মুসলিম সমাজের অন্তর্লোকের অনুসন্ধান
 
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে হিনা বুঝতে পারেন, মুসলিম সমাজের বিষয়গুলো খুব কমই উঠে আসে। মারাঠি সাংবাদিকতায় এই বিষয়ের অভাব তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন। তিনি বলেন, “মুসলিম বিষয় নিয়ে খুব কম লেখা হয়। আলোচনাগুলো বেশিরভাগ সময় উৎসব বা কিছু প্রচলিত ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইতিহাসকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা কম। আমি চেয়েছিলাম শিক্ষিত মুসলিম তরুণদের ভাবনা, তাদের ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে।”
 
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ‘সাধনা’ সাপ্তাহিকের গোবিন্দরাও তালওয়ালকর ফেলোশিপের মাধ্যমে এই বিষয় নিয়ে গভীরভাবে লেখালেখি করেন। তিনি মুসলিম সমাজের সমস্যাগুলোও তুলে ধরেন, তবে তা কখনো একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং মানুষের অন্তর্নিহিত সংগ্রামকে সামনে আনেন।
 
হিনা কৌসর খান
 
সাহিত্যে প্রবেশ: ‘ইত্রনামা’ থেকে ‘ইজতিহাদ’
 
তাঁর লেখা দীর্ঘ প্রতিবেদন “তিন তালাক বিরুদ্ধ পাঁচ মহিলা” অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় এবং পরে তা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মধ্যে অনেক অভিজ্ঞতা থাকে, যা সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। সেই অভিজ্ঞতাগুলো তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “সংবাদে যা বলা যায় না, তা আমি গল্পের মাধ্যমে বলতে চেয়েছি।”
 
তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ইত্রনামা’, যা ‘স্টোরিটেল’-এ অডিও আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরে তা বই আকারেও প্রকাশিত হয়। নাজিয়া, আসাদ ও সুমিত, এই তিন চরিত্রকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাসে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলিম তরুণদের সম্পর্ক ও সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। এই বইয়ের জন্য তিনি ‘কবিবর্য এন. ডি. মহানোর সাহিত্য পুরস্কার’ এবং রাজ্য সরকারের ‘এইচ. এন. আপটে পুরস্কার’ লাভ করেন।
 
তাঁর নন-ফিকশন বই ‘ধর্মরেখা অতিক্রম’ আন্তঃধর্মীয় দম্পতিদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক লেখা। এছাড়া ‘লোকসত্তা’ পত্রিকায় প্রকাশিত মুসলিম সমাজ নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক লেখাগুলো ‘ইজতিহাদ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। রামজান বিশেষ সংখ্যা ‘নবজ’-এ বিলকিস বানো ও তাঁর স্বামীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা একটি সংবেদনশীল প্রবন্ধের জন্য তিনি ‘লাডলি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।
 
হিনা কৌসার খানের রচিত 'ইজতিহাদ', 'ইত্রনামা', 'ধর্মরেশা' বইয়ের প্রচ্ছদ
 
সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি
 
হিনা সামাজিক মাধ্যমেও অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি শুধুমাত্র নিজের বই বা সাফল্যের প্রচারেই সীমাবদ্ধ নন, বরং সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে স্পষ্ট মত প্রকাশ করেন। তাঁর ফেসবুক সিরিজ “ভিন্তিশি মারলেল্যা গাপ্পা” বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
 
সমকালীন বাস্তবতার প্রতিফলন
 
বর্তমান সমাজের অস্থিরতা ও ঘৃণার পরিবেশের মধ্যেও হিনা অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমি এখন বেশি করে গল্প লিখছি, তবে তা সমকালীন ঘটনার প্রভাব বহন করে। ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছি, যেখানে মব লিঞ্চিংয়ের মতো বিষয় উঠে আসবে।”
 
“মানবতা ও সহাবস্থানে আমার বিশ্বাস আছে”
 
হিনার জীবনের দর্শন অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস ভালোবাসা, মানবতা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহাবস্থানে। মানুষের ত্রুটি থাকতেই পারে, কিন্তু আমরা একে অপরকে বুঝে এগিয়ে যেতে পারি।” তিনি আরও বলেন, “সব মানুষ যদি একরকম হতো, তবে জীবনে বৈচিত্র্য থাকত না। এই ভিন্নতাই আমাদের সমৃদ্ধ করে।”
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Heena Khan (@green_heena)

 
মারাঠি সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে হিনা খানের লেখায় যে গভীরতা ও পরিপক্বতা
দেখা যায়, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দাখনি ও উর্দু শব্দের ব্যবহার তাঁর লেখাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।মুসলিম সমাজের একজন ‘অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন’ লেখক হিসেবে তিনি যে বর্ণনা তৈরি করেছেন, তা অত্যন্ত মূল্যবান।
 
তাঁর নিজের কথায়, “যেখানেই আমার ভাবনা প্রকাশের সুযোগ থাকবে, আমি লিখে যাব।” ধর্মের সীমারেখা মুছে দিয়ে মানবতার নতুন ভাষা তৈরি করা, এই পথেই হিনা কৌসর খানের কলম আগামী দিনেও সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।