কলকাতার চাঁদনীর ব্যস্ততার মাঝেও আইসিএসই-তে ৯৬%, মুসলিম পরিবারের ছেলে সাদ্দানের অনবদ্য সাফল্য

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 2 h ago
কলকাতার চাঁদনীর ব্যস্ততার মাঝেও আইসিএসই-তে ৯৬%, মুসলিম পরিবারের ছেলে সাদ্দানের অনবদ্য সাফল্য
কলকাতার চাঁদনীর ব্যস্ততার মাঝেও আইসিএসই-তে ৯৬%, মুসলিম পরিবারের ছেলে সাদ্দানের অনবদ্য সাফল্য
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র চাঁদনী, অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, সারাদিনের ব্যস্ত বাজার, দোকানপাট, ব্যবসা আর কোলাহলে ভরা এক চিরচেনা এলাকা। যেখানে নিস্তব্ধতা প্রায় দুর্লভ, সেখানে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা অনেকের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জকেই জয় করে এবারের আইসিএসই পরীক্ষায় ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে সাফল্যের নজির গড়ল চাঁদনীরই ছেলে মোঃ সাদ্দান হোসান। এক সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার থেকে উঠে এসে তার এই সাফল্য শুধু পরিবারের নয়, গোটা এলাকার কাছেই গর্বের।
 
শৈশবে ক্যালকাটা বয়েজে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে ডন বসকো স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসে সাদ্দান। ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার আলাদা মনোযোগ ছিল। পরীক্ষার সময়ই তার মনে হয়েছিল ফল ভালো হতে পারে, কারণ নিজের প্রস্তুতি নিয়ে সে আত্মবিশ্বাসী ছিল। তবে এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে ছিল দীর্ঘ পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ এবং কঠোর অধ্যবসায়।
 
সাদ্দান হোসান তার পরিবারের সঙ্গে
 
সাদ্দানের কথায়, প্রি-বোর্ডের ফল আশানুরূপ না হওয়ায় সে প্রথমে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। সাধারণত অনেকেই এই সময় মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু সে নিজেকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। বরং প্রি-বোর্ডের পরবর্তী দু’মাসকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরে নিয়ে আরও বেশি পরিশ্রম করেছে। নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিদিন ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নিয়েছে। তার বিশ্বাস ছিল, পরিশ্রম কখনো ব্যর্থ হয় না।
 
চাঁদনীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকায় বসবাস করে পড়াশোনায় সাফল্য পাওয়া নিঃসন্দেহে সহজ ছিল না। চারপাশে সারাক্ষণের শব্দ, মানুষের আনাগোনা, বাজারের ব্যস্ততা, সব কিছুর মধ্যেও নিজেকে বোর্ড পরীক্ষার জন্য তৈরি করা ছিল কঠিন। এই এলাকার অধিকাংশ পরিবারই ছোটখাটো ব্যবসা বা দোকানের উপর নির্ভরশীল। সাদ্দানের পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তার মা-বাবা সবসময় চেয়েছেন ছেলে নিজের প্রতিভাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিক।
 
সাদ্দানের মা জানান, ছোট থেকেই ছেলে অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত স্বভাবের এবং বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পরিবারের সকলেই জানতেন, সুযোগ পেলে সে বড় কিছু করবেই। তাই আর্থিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা কখনো তার পড়াশোনার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেননি। মা-বাবার সেই সমর্থনই ছিল তার এগিয়ে চলার প্রধান শক্তি।
 
৩০ এপ্রিল প্রকাশিত আইসিএসই পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন পরিবারে ছিল চরম উৎকণ্ঠা। সাদ্দান নিজেও ভয় পাচ্ছিল, যদি প্রত্যাশামতো ফল না হয়! কিন্তু ফল প্রকাশের পর ৯৬ শতাংশ নম্বর দেখে আনন্দে ভরে ওঠে গোটা পরিবার। বিশেষ করে তার অসুস্থ ঠাকুমা, যিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, নাতির এই সাফল্যের খবর শুনে যেন নতুন প্রাণ ফিরে পান। পরিবারের সদস্যদের কথায়, সেই আনন্দ তার অসুস্থতার অনেকটাই দূর করে দেয়। ছোট ভাই-বোনদের কাছেও আজ সাদ্দান এক বড় অনুপ্রেরণা।
 
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলেও উজ্জ্বল তার মেধা। প্রিয় বিষয় বায়োলজিতে সে পেয়েছে পূর্ণ ১০০ নম্বর। দ্বিতীয় প্রিয় বিষয় কম্পিউটারে পেয়েছে ৯৯। ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে সে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজের জন্য কাজ করাই তার লক্ষ্য।
 
চাঁদনীর ব্যস্ততা, সীমাবদ্ধতা আর প্রতিকূলতার মাঝেও মোঃ সাদ্দান হোসান প্রমাণ করে দিয়েছে, স্বপ্ন যদি দৃঢ় হয়, পরিশ্রম যদি সত্যিকারের হয়, তবে সাফল্য আসবেই। তার এই কৃতিত্ব শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, এটি অধ্যবসায়, পারিবারিক সমর্থন এবং আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।