সীমান্তের সংখ্যালঘু গ্রামে বদলের হাওয়া! মেয়েদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে বিশেষ অভিযান, বাল্যবিবাহমুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে জাকিরপুরের পরিবারগুলো

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
সীমান্তের সংখ্যালঘু গ্রামে বদলের হাওয়া! মেয়েদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে বিশেষ অভিযান, বাল্যবিবাহমুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে জাকিরপুরের পরিবারগুলো
সীমান্তের সংখ্যালঘু গ্রামে বদলের হাওয়া! মেয়েদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে বিশেষ অভিযান, বাল্যবিবাহমুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে জাকিরপুরের পরিবারগুলো
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ ব্লকের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জাকিরপুর গ্রামে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষ সচেতনতা অভিযান শুরু হল। ২ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া টানা ১৭ দিনের এই কর্মসূচিতে জাকিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েত গ্রামের প্রতিটি পরিবারকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ একটাই, এই সচেতনতার মাধ্যমে স্কুলছুট পড়ুয়া ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলির কাছে পৌঁছে সঠিক বার্তা দেওয়া।
 
প্রশাসন সূত্রে খবর, আগামী মার্চের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ জাকিরপুরকে বাল্যবিবাহমুক্ত গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার ভাবনা রয়েছে। তবে একথা ঠিক, বাল্যবিবাহ আটকাতে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে থেমে থাকলে চলবে না। সামাজিক এই সমস্যাকে নির্মূল করতে প্রয়োজন  সামাজিক সচেতনতা আর প্রতিটি পরিবারের সদিচ্ছা। তবেই এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত গড়ে তুলবে জাকিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েত।
 
জাকিরপুর গ্রামে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষ সচেতনতা অভিযান
 
লক্ষ্য একটাই, অল্প বয়সে বিয়ের বন্ধনে নয়, মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠুক শিক্ষা আর আত্মনির্ভরতার ভিতের উপর। প্রশাসনিক স্তর থেকে বারবার বলা হচ্ছে, শুধু সভায় অংশ নিয়ে থেমে গেলে হবে না। প্রত্যেককে সজাগ হতে হবে। আর এই লক্ষ্য কার্যকর করতে তাই এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে বোঝানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
 
বলা ভালো, এই উদ্যোগের পিছনেও রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ভাবনা রয়েছে প্রশাসনিক স্তরে। গত ২ অক্টোবর গান্ধীজির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ গ্রামসভায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিতেই দক্ষিণ জাকিরপুর ও উত্তর জাকিরপুর গ্রাম সংসদে শুরু হয়েছে এই বিশেষ সচেতনতা অভিযান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পঞ্চায়েত কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী সহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই সচেতনার বার্তাকে প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছে।
 
এক্ষেত্রে দেখা গেল, বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে স্কুলছুট পড়ুয়া থেকে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলির উপর। কারণ একটাই, কোন মেয়ে স্কুলছুট হয়ে পড়লে নিম্ন আয় সম্পন্ন পরিবারে অনেক সময় তার অকালবিবাহের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। তাই বিয়ে আটকানো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি মেয়েকেই পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখা দরকার। আর পঠনপাঠনের মধ্যে থাকলেই  এবং ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি হবে মেয়েদের মধ্যে। যা এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
 
জাকিরপুর গ্রামে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষ সচেতনতা অভিযান
 
এই বিশেষ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন শক্তি বাহিনী ও ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন’-এর জেলা সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান, জাকিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সচিব অরুন্ধতী সরকার, এএনএম, আইসিডিএস কর্মী এবং পঞ্চায়েত সদস্যরা। প্রত্যেকেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিজেদের দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন।
 
এই উদ্যোগের মাপকাঠি দেখে স্বস্তির আভাস পাচ্ছেন উপস্থিত সকলেই। স্থানীয় বাসিন্দা, আইসিডিএস ও আশা কর্মীদের দাবি, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে এখনও পর্যন্ত এলাকায় কোনও বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেনি। তাঁদের নজরে আসেনি কিশোরী অবস্থায় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাও। ফলে তাঁদের দেওয়া এই তথ্য নিঃসন্দেহে উৎসাহ জোগাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সকলকে। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতি ধরে রাখতে লাগাতার নজরদারি ও সচেতনতা যে জরুরি, তা-ও বুঝছেন উদ্যোক্তারা।
 
এটুকু জানা গেছে, কর্মসূচির পরবর্তী লক্ষ্য আরও বড়। আগামী মার্চের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ জাকিরপুর, এই দুই গ্রাম সংসদকে বাল্যবিবাহমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। অভিযানের সূচনায় উপস্থিত সকলকে নিয়ে শপথবাক্য পাঠ করান পঞ্চায়েত সচিব অরুন্ধতী সরকার। মিজানুর রহমান জানালেন, কুমারগঞ্জ ব্লকের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জাকিরপুরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সকলকে সঙ্গে নিয়েই এই বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগ সফল হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
 
জাকিরপুর গ্রামে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষ সচেতনতা অভিযান
 
সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রাম থেকে উঠে আসছে এক আশাব্যঞ্জক বার্তা। তবে একথা মানতেই হবে, মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে বদলাতে হবে সামাজিক মানসিকতা। যে মানসিকতা নিয়ে এগোতে চাইছে জাকিরপুর। আগামী মার্চে বাল্যবিবাহমুক্ত গ্রামের স্বীকৃতি আদায় করতে পারে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।


শেহতীয়া খবৰ