গৌতম বর্ধন ও এ পি জে আব্দুল কালামের সাথে তাঁর একটি ছবি
সুদীপ শর্মা চৌধুরী / গুয়াহাটি
শিল্পের ভাষা যে কতটা গভীর হতে পারে, তারই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত অসমের হোজাই জেলার লামডিংয়ের চিত্রশিল্পী গৌতম বর্ধন। রং, তুলি কিংবা জলরঙের বদলে নিজের রক্তকেই তিনি বেছে নিয়েছেন ছবি আঁকার মাধ্যম হিসেবে। তাঁর কাছে এই শিল্প কেবল সৃজনশীলতার প্রকাশ নয়, বরং বিশ্বশান্তি, মানবতা, সম্প্রীতি ও মানুষের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক বিশেষ প্রয়াস।
নিজের রক্ত দিয়ে দেশের বহু মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং বিশিষ্ট মানুষের প্রতিকৃতি এঁকেছেন তিনি। শিল্পীর দাবি, এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৪০টি এমন ছবি তৈরি করেছেন তিনি। আর এই দীর্ঘ শিল্পযাত্রার অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, ‘মিসাইল ম্যান’ এ পি জে আব্দুল কালামের সঙ্গে।
২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি। লামডিংয়ের এই শিল্পীর জীবনে দিনটি আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেদিন রাষ্ট্রপতি ভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান গৌতম বর্ধন। তাঁর হাতে তুলে দেন নিজের রক্ত দিয়ে আঁকা কালামের একটি প্রতিকৃতি। শিল্পীর কথায়, সেই উপহার পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। এমনকী, উপহারটিকে নিজের জীবনের প্রথম মূল্যবান উপহার বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। কালাম জানিয়েছিলেন, এই অমূল্য স্মারক তিনি নিজের কাছে সযত্নে রেখে দেবেন।
শুধু উপহার গ্রহণ করেই থেমে থাকেননি কালাম। গৌতমের শিল্পকর্ম ও তাঁর ভাবনার প্রশংসা করে তাঁকে আশীর্বাদও করেন। নিজের রক্ত দিয়ে বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে ছবি আঁকার উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। গৌতমের কথায়, কালাম তাঁকে বলেছিলেন, জীবনে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন। সেই সাক্ষাৎ এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির আশীর্বাদ আজও তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা। পাল্টা উপহার হিসেবে গৌতমের হাতে নিজের আত্মজীবনী ‘উইংস অফ ফায়ার’ এবং একটি শঙ্খ তুলে দিয়েছিলেন এ পি জে আব্দুল কালাম। শিল্পীর কাছে এই স্মৃতি শুধু একটি সাক্ষাতের ঘটনা নয়, বরং তাঁর দীর্ঘ শিল্পসাধনার পথে এক মূল্যবান প্রাপ্তি।
স্ত্রী সঙ্গীতা, ছেলে সাহেবের সঙ্গে গৌতম বর্ধন
তবে গৌতম বর্ধনের এই ব্যতিক্রমী শিল্পযাত্রার সূচনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯৯৬ সালে অসমে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ যখন চরম আকার ধারণ করেছিল, সেই সময় লামডিংয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আয়োজন করা হয়। বিশিষ্ট নেতাজিপ্রেমী বিজন সিংহের নেতৃত্বে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা থেকেই নিজের রক্ত দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি চন্দ্র বসুর প্রতিকৃতি তৈরি করেন গৌতম। তাঁর জীবনে সেটিই ছিল রক্ত দিয়ে ছবি আঁকার প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রয়াস। এই উদ্যোগের জন্য কলকাতার মহাজাতি সদনে ‘ভয়েস অফ ওয়ার্ল্ড’-এর তরফে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। উল্লেখ্য, মহাজাতি সদনের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
সেই শুরু। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি গৌতমকে। নিজের রক্তকে তুলির রং করে তিনি একের পর এক প্রতিকৃতি তৈরি করতে থাকেন। তাঁর ছবির বিষয়বস্তুতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এমন সব ব্যক্তিত্ব, যাঁদের জীবন ও কর্ম মানুষের মধ্যে মানবতা, সাহস, আত্মত্যাগ, সাম্য এবং শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর আঁকা ছবির তালিকায় রয়েছেন নোবেলজয়ী মাদার টেরেসা, অসমের স্বাধীনতা আন্দোলনের কনিষ্ঠ শহিদ কনকলতা বড়ুয়া, মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং স্বামী বিবেকানন্দ। পাশাপাশি মেরি ও যিশুখ্রিস্টের মতো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতিও এঁকেছেন তিনি।
গৌতমের মতে, এই ব্যক্তিত্বদের জীবন ও আদর্শের মধ্যে এমন কিছু মূল্যবোধ রয়েছে, যা দেশ, ধর্ম ও ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে পারে। তাই তাঁদের প্রতিকৃতি আঁকার মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বশান্তি ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দিতে চান। তাঁর কাছে রক্ত দিয়ে ছবি আঁকা কোনও চমক সৃষ্টি করার কৌশল নয়; বরং নিজের শিল্পের মাধ্যমে একটি গভীর বার্তা তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
রক্ত দিয়ে তৈরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি
দেশের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার সময় গৌতম তাঁর প্রতিকৃতি নিজের রক্ত দিয়ে তৈরি করেন। এরপরও বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি এঁকেছেন তিনি। শিল্পীর দাবি, গত কয়েক বছরে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন। তাঁর এই শিল্পচর্চার তালিকায় জায়গা পেয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও।
গৌতম জানান, অসমের উন্নয়ন এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতি তাঁর আগ্রহ থেকেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রতিকৃতি আঁকার সিদ্ধান্ত নেন। মুখ্যমন্ত্রীর জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে নিজের রক্ত দিয়ে তাঁর ছবিও তৈরি করেন তিনি। শিল্পীর বিশ্বাস, মা কামাখ্যার আশীর্বাদ ছাড়া হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অসমের অগ্রগতির পথে অনেক কাজ সম্ভব হত না। সেই ভাবনা থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিকৃতির মাধ্যমে নিজের শ্রদ্ধা ও অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বলে জানান গৌতম।
তবে এতগুলি ছবি তৈরি করলেও তাঁর স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কাছে বিনম্র আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ইচ্ছা, তাঁরা যেন একবার হোজাই জেলার লামডিংয়ে তাঁর বাড়িতে আসেন এবং নিজের রক্ত দিয়ে তৈরি ছবিগুলি দেখেন। শুধু দেখাই নয়, শিল্পীর আশা, তাঁরা তাঁর আঁকা প্রতিকৃতিগুলি সংগ্রহ করবেন। তাঁর মতে, এই শিল্পকর্মগুলির মাধ্যমে বিশ্বশান্তির যে বার্তা তিনি দিতে চেয়েছেন, তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।
রক্ত দিয়ে তৈরি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ছবি
প্রায় ১৪০টি রক্তচিত্রের এই সংগ্রহ গৌতম বর্ধনের দীর্ঘ শিল্পসাধনা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তাঁর কাজের বিষয়বস্তুতে যেমন রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ভাবনা। লামডিংয়ের এই শিল্পী প্রচলিত শিল্পমাধ্যমের বাইরে গিয়ে নিজের শরীরের রক্তকে ছবির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে রক্ত দিয়ে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়েছে, যা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
শিল্পের মূল উদ্দেশ্য মানুষের মনে অনুভূতি জাগানো। গৌতম বর্ধন নিজের মতো করে সেই কাজটিই করে চলেছেন। তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠছে এমন সব মানুষের মুখ, যাঁদের জীবন ও আদর্শ বহু প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। নিজের রক্তে আঁকা প্রতিটি ছবির মধ্য দিয়ে তিনি যেন একটাই বার্তা দিতে চান, পৃথিবীতে বিভেদ নয়, প্রয়োজন শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বন্ধন।