তরুণ নন্দী, কলকাতা:
ক্যানভাসে রং-তুলির আঁচড় নয়, নেই কালির ছোঁয়াও। রেশমের সুতো আর তাঁতের নিখুঁত কারুকাজে ফুটে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখ। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে নদিয়ার ফুলিয়ার পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত তাঁতশিল্পী বীরেন কুমার বসাকের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে এই অভিনব জামদানি লাইন-আর্ট পোর্ট্রেট।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন ১৭ সেপ্টেম্বর। সেই বিশেষ দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলার তাঁতশিল্পীদের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ শিল্পকর্ম। এটি কোনও ছাপা ছবি নয়, জামদানি বুনন পদ্ধতিতেই সূক্ষ্ম রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোদির মুখাবয়ব। শিল্পকর্মটি বাণিজ্যিক বিক্রির জন্য নয়; জন্মদিনের উপহার হিসেবেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই বিশেষ কাজটি সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ১০ দিন। বীরেন বসাকের দলের দক্ষ তাঁতশিল্পী বিবেক বিশ্বাস তাঁর হাতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিকৃতিটি। সিল্কের জামদানির ওপর সূক্ষ্ম বুননকৌশলের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে পুরো লাইন-আর্ট। ফলে প্রতিকৃতিটি যেমন শিল্পকর্ম, তেমনই বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের কারিগরি দক্ষতারও এক অনন্য নিদর্শন।
জামদানিতে এই ধরনের লাইন-আর্ট পোর্ট্রেট তৈরির কাজ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৬ সালের দিকে বীরেন বসাকের ছেলে অভিনব বসাকের ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি দিয়ে এই ধারার সূচনা হয়েছিল। পরে স্বামী বিবেকানন্দ-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতিও জামদানির বুননে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তৈরি হল প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি।
রেশমের সুতোয় ফুটল মোদির মুখ, ১০ দিনের বুননে চমক বীরেন বসাকের
এই শিল্পকর্মের বিশেষত্ব এখানেই যে, সাধারণ ছবি আঁকার বদলে তাঁতের সুতো দিয়েই তৈরি হয়েছে মুখের প্রতিটি রেখা ও অবয়ব। সূক্ষ্ম এই কাজের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলেও পুরো নকশার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই দক্ষতা ও ধৈর্যের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়েছে তাঁতশিল্পীদের।বীরেন বসাকের পরিবারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিচয় অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালে পদ্ম পুরস্কারপ্রাপকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বীরেন বসাকের তৈরি একটি জামদানি শিল্পকর্ম প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। সেই শিল্পকর্মে মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
এর আগেও বীরেন বসাকের তৈরি শিল্পকর্ম জাতীয় স্তরে প্রশংসা পেয়েছে। তাঁতশিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পদ্মশ্রী-সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০২৬ সালেও তাঁর ছেলে অভিনব বসাক জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, যা বসাক পরিবারের তাঁতশিল্পের ধারাবাহিক সাফল্যেরই পরিচয়।
বীরেন বসাকের বক্তব্য, এই শিল্পকর্ম তৈরির মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক নয়। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে বাংলার তাঁতশিল্পীদের পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার দেওয়ার পাশাপাশি জামদানি বুননের সূক্ষ্মতা ও সম্ভাবনাকেও তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
ফুলিয়া থেকে তৈরি এই বিশেষ জামদানি পোর্ট্রেট প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে জন্মদিনের উপহার হিসেবে দিল্লিতে পৌঁছবে বাংলার তাঁতশিল্পের এই অভিনব নিদর্শন।
রেশমের সুতোয় বোনা এই প্রতিকৃতি তাই শুধু একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মুখাবয়ব নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য, তাঁতশিল্পীদের দক্ষতা এবং নতুন ভাবনায় পুরনো শিল্পকে তুলে ধরার প্রয়াস।