বাঙালি বৃদ্ধকে ‘বাংলাদেশি’ বলে পুশব্যাক আটকে দিল আদালত! তিন মাস পর সসম্মানে জেলমুক্ত জলিল আখতার, পরিবারে এল স্বস্তি
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
অবশেষে আইনি লড়াইয়ে জয় এল। বাংলাদেশি তকমা মুছে ফেলে অবশেষে মুক্তি পেলেন প্রায় ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ জলিল আখতার। তিন মাস ধরে দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে অবশেষে স্বস্তি ফিরল উত্তরবঙ্গের করণদিঘির বাঘরই গ্রামের জলিল আখতারের পরিবারে। বৃদ্ধ সংখ্যালঘু এই ভারতীয় নাগরিককে একপ্রকার জোর করে ‘বাংলাদেশি’ বলে পুশব্যাকের চেষ্টা ভেস্তে দিয়ে ইসলামপুর আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছে।
পরিবার সূত্রে খবর, গত ১৯ জুন রাতে জলিলকে বাড়ি থেকে একপ্রকার তুলে নিয়ে যায় ডালখোলা থানার পুলিশ। পরিবারের দাবি, কোনো রকম আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাঁকে প্রথমে ফুলবাড়ি হোল্ডিং সেন্টার নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে চাকুলিয়ার নিজামপুর ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ কর্মসূচির নামে তড়িঘড়ি হয়ত জলিলকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হত। গত ২২ জুলাই পুলিশ তাঁকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আদালতে পেশ করে।
জলিল যে অনুপ্রবেশকারী নন তার সমস্ত প্রমাণ ছিল পরিবারের কাছে। ১৯৬৭ সালের জমির দলিল, ২০০২ ও বর্তমান ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং রেশন কার্ডের মতো সমস্ত বৈধ ভারতীয় নথিপত্র ছিল তাঁর। বিচারকের জিজ্ঞাসাবাদে জন্মস্থান, পেশা ও পরিবারের বিভিন্ন তথ্যের সঠিক উত্তর দেন জলিল। উপস্থিত স্ত্রী তওফা বিবি ও কন্যা কুলসুম বেগমের পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি নথি খতিয়ে দেখার পর নথির সত্যতা স্বীকার করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।
আইনজীবী সাহিদ রেজা
শেষ পর্যন্ত আদালতের শর্ত সাপেক্ষে জামিন পান জলিল। জলিলের আইনজীবী সাহিদ রেজা বলেন, 'জটিল আইনি লড়াইয়ের পরে জামিন মিলেছে। তাঁর নথিপত্র যাচাই করে সেগুলির বৈধতা স্বীকার করে আদালতে রিপোর্ট পেশ করেন তদন্তকারীরা। স্ত্রী-সহ পরিবারের পাঁচ জনের নথিপত্র দেখেও আদালত সন্তুষ্ট হয়।' এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন জলিলের ভাই মতিউর রহমান। তিনি বলেন, 'সব কাজকর্ম ফেলে তিন মাস ধরে নানা প্রশাসনিক দপ্তর ও আদালতে ছোটাছুটি করতে গিয়ে আমরা মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। জমির যা ফসল ছিল সব বিক্রি করে মামলা লড়েছি। অবশেষে আজকে জামিন হলো। সব কাগজপত্র থাকার পরেও অকারণে একটি পরিবারকে চরম বিপদে ফেলা হলো। একজন গরিব বৃদ্ধ মানুষকে হেনস্থা করা হলো।'
প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি। সংগঠনের আহ্বায়ক দুলাল রাজবংশীর অভিযোগ, 'বৈধ ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও জলিলকে বাংলাদেশে পুশব্যাকের চক্রান্ত হয়েছে। পরিবারের হার না মানা মনোভাব এবং আমাদের আন্দোলনের চাপে প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অনুপ্রবেশের মামলা সাজিয়ে মুখরক্ষার চেষ্টাও ব্যর্থ হলো।' সমিতির দাবি, জলিলের মতো আরও অনেক মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন, হয়ে চলেছেন। যেনতেন প্রকারে কিছু মানুষকে জোর করে পুশব্যাকের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন। নথিপত্র যাচাইয়েরও তোয়াক্কা করছে না। এই নিগ্রহ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
জলিল আখতারকে মুক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা দুলাল রাজবংশীর
শেষপর্যন্ত আইনি কাঠামোর ওপর ভর করেই নিজের দেশে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার ফিরে পেলেন জলিল আখতার। জামিনে মুক্ত হয়ে জলিল জানালেন, আমি লেখাপড়া জানিনা বলেই আমার এই অবস্থা। আমি তো দীর্ঘদিন ধরেই এদেশে থাকি, তবুও কেন আমার সঙ্গে এমনটা করল বুঝতে পারছিনা। জামিন পেয়েও একরাশ হতাশা নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটলেন জলিল আখতার।