বিশ্বকাপে প্রথম ধাক্কা স্পেনের! কেপ ভার্দের রক্ষণে আটকে ‘লা রোজা’, প্রশ্নের মুখে কোচের কৌশল
মাদ্রিদ,স্পেন:
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুতেই বড় অঘটন। ইউরো চ্যাম্পিয়ন এবং শিরোপার অন্যতম দাবিদার স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে। মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে লা রোজার এমন হোঁচট অনেককেই অবাক করেছে।
ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে স্পেন ছিল পরিষ্কার ফেভারিট। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। শুরু থেকেই কেপ ভার্দে রক্ষণাত্মক, সুশৃঙ্খল ও ধৈর্যশীল ফুটবল খেলেছে। নিজেদের অর্ধে খেলোয়াড়দের গুছিয়ে রেখে তারা স্পেনের আক্রমণের সব পথ প্রায় বন্ধ করে দেয়।
বল ছিল স্পেনের, ম্যাচ ছিল কেপ ভার্দের
পুরো ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বলের দখল ছিল স্পেনের, কিন্তু সেই আধিপত্য কার্যকর আক্রমণে রূপ দিতে পারেনি তারা। মিকেল ওয়ারিয়াসাবালকে ঘিরে তৈরি হওয়া আক্রমণভাগ ছিল নিষ্প্রভ। ডান প্রান্তে ফেরান তোরেসের পরীক্ষা ব্যর্থ হয়, আর মাঝমাঠে গাভিও নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না।
অন্যদিকে, ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা যেন সময়কে পিছনে ফেলে দুর্দান্ত সব সেভ করে কেপ ভার্দেকে এনে দেন ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ফলাফল।
যামাল নামতেই বদলে যায় ম্যাচের গতি
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল তরুণ তারকা লামিনে যামালকে বেঞ্চে রাখা। যদিও সাম্প্রতিক চোটের কারণে তাকে বিশ্রাম দেওয়ার যুক্তি ছিল, তবুও যামাল মাঠে নামার আগ পর্যন্ত স্পেনের আক্রমণে ছিল না কোনো গতি বা সৃজনশীলতা।
৭১ মিনিটে যামাল নামার পরই বদলে যায় ছবিটা। মাত্র কুড়ি মিনিট খেলেই তিনি ম্যাচে সর্বোচ্চ পাঁচটি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেন। কিন্তু ততক্ষণে কেপ ভার্দে নিজেদের বক্সের সামনে প্রায় প্রাচীর গড়ে তুলেছে।
ভুলে গেল স্পেন নিজের সাফল্যের সূত্র?
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের মূল শক্তি ছিল *লামিনে যামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো দ্রুতগতির উইঙ্গারদের সরাসরি আক্রমণাত্মক ফুটবল। ইউরো জয়ের পথেও এই কৌশলই তাদের এগিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেন আবার ফিরে যায় পুরনো, অতিরিক্ত পজেশননির্ভর ফুটবলে—যে দর্শন একসময় তাদের সোনালি যুগের অবসানের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো জয়ের পর প্রতিপক্ষরা স্পেনের একঘেয়ে ছন্দ বুঝে ফেলেছিল, আর সেই ভুলের পুনরাবৃত্তিই যেন দেখা গেল এই ম্যাচে।
কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক রাত
পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে মাত্র একটি ফাউল করেছে কেপ ভার্দে—১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দলের সবচেয়ে কম ফাউলের অন্যতম রেকর্ড এটি। আতঙ্ক নয়, অযথা আগ্রাসন নয়; বরং নিখুঁত পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস দিয়েই তারা রুখে দিয়েছে ইউরোপের অন্যতম সেরা দলকে।
স্পেনের জন্য সতর্কবার্তা
বিশ্বকাপের পথ এখনও দীর্ঘ। প্রতিভার অভাব নেই স্পেনের দলে। তবে এই ম্যাচ প্রমাণ করে দিয়েছে, শুধু বল দখলে রাখলেই জয় আসে না। যামাল, নিকো উইলিয়ামসদের গতিময়তা ও সৃজনশীলতাকে যদি পরিকল্পনার কেন্দ্রে না রাখা হয়, তাহলে শিরোপার স্বপ্ন খুব দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র হয়তো মাত্র এক পয়েন্ট হারানো। কিন্তু স্পেনের জন্য এটি আরও বড় কিছু—নিজেদের পরিচয় ভুলে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে এক কঠিন সতর্কবার্তা।