আন্তর্জাতিক দাবার মঞ্চে বাংলার গর্ব, কেআইআইটি ইন্টারন্যাশনালে চ্যাম্পিয়ন তমলুকের শঙ্খদীপ
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
আন্তর্জাতিক দাবার মঞ্চে আবারও উজ্জ্বল হল বাংলার নাম। পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের তরুণ দাবাড়ু শঙ্খদীপ মাইতি ওড়িশার ভুবনেশ্বরে অনুষ্ঠিত ১৭তম কেআইআইটি ইন্টারন্যাশনাল চেস ফেস্টিভ্যালে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে চ্যাম্পিয়নের মুকুট জিতেছেন। কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজের মেধা, ধৈর্য ও কৌশলের পরিচয় দিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বাংলার দাবা প্রতিভা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমানভাবে সমাদৃত।
ক্যাটাগরি-বি বিভাগে মোট ৯ রাউন্ডের লড়াই শেষে শীর্ষস্থান দখল করেন শঙ্খদীপ। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তিনি ট্রফি ও ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার নগদ পুরস্কার অর্জন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, উগান্ডা-সহ প্রায় ২০টি দেশের প্রতিযোগীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। শুধু ক্যাটাগরি-বি বিভাগেই অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৭০০ জন দাবাড়ু। সেই বিপুল প্রতিযোগিতার মধ্যে সেরার শিরোপা ছিনিয়ে এনে বাংলাকে গর্বিত করেছেন তমলুকের এই যুবক।
বর্তমানে তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র শঙ্খদীপ। তাঁর দাবা-জীবনের শুরু ২০১৪ সালে, মায়ের হাত ধরেই। এরপর নিয়মিত অনুশীলন, প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধান এবং নিরলস পরিশ্রম তাঁকে ধীরে ধীরে পৌঁছে দেয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবার মঞ্চে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশের একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর উচ্ছ্বসিত শঙ্খদীপ জানান, “এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট ছিল। গত দু’মাস ধরে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এত বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে দাবাকেই নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।”
ছেলের এই সাফল্যে আনন্দে আত্মহারা পরিবারও। শঙ্খদীপের মা দীপান্বিতা রায় মাইতি বলেন, “আন্তর্জাতিক স্তরে ও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শুনে আনন্দে চোখে জল এসে গিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে নিষ্ঠা দেখেছি। আগামী দিনেও ওর স্বপ্নপূরণে আমরা পাশে থাকব।”
অন্যান্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে মঞ্চে শঙ্খদীপ
বাবা চিকিৎসক শঙ্কর মাইতি জানান, “শঙ্খদীপ এর আগে থাইল্যান্ড-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। দেশের প্রায় ১৭টি রাজ্যে প্রতিযোগিতা খেলে একাধিক পুরস্কারও জিতেছে। তবে এই সাফল্যই এখনও পর্যন্ত ওর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আর্থিক কারণে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে সে আরও বড় মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করুক, সেটাই আমাদের আশা।”
শঙ্খদীপের এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পূর্ব মেদিনীপুর তথা সমগ্র বাংলার দাবা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় দাবা খেলার প্রসার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দাবা সংস্থা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠছে। সেই প্রেক্ষাপটে শঙ্খদীপের এই আন্তর্জাতিক সাফল্য নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুদের কাছে নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
বাংলার মেধা ও প্রতিভা যে বিশ্বমঞ্চেও সমান উজ্জ্বল, শঙ্খদীপ মাইতির এই জয় তারই আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ।