ভক্তি চালক
দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পরিষেবা আইএএস (IAS)-এ স্থান পাওয়া লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। কিন্তু দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে এই স্বপ্ন পূরণ করা সত্যিই এক অসাধারণ কৃতিত্ব। মহারাষ্ট্রের ইয়াভতমাল জেলার এক অটোরিকশাচালকের মেয়ে আদিবা আনম নিজের অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রমের জোরে এই প্রায় অসম্ভব লক্ষ্য অর্জন করে মহারাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম মহিলা আইএএস কর্মকর্তা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আওয়াজ-দ্য ভয়েস-এর ‘পরওয়াজ’ ধারাবাহিকে আজ জেনে নেওয়া যাক এই সাহসী তরুণীর অনুপ্রেরণাদায়ক জীবনসংগ্রামের গল্প।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবর গোটা মহারাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেদিন রচিত হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। কারণ সেদিনই ইউপিএসসি (UPSC) ২০২৪-এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল এবং মহারাষ্ট্র পেয়েছিল তার প্রথম মুসলিম মহিলা আইএএস কর্মকর্তা। ইয়াভতমালের একটি ছোট গ্রামে বসবাসকারী এক সাধারণ মুসলিম অটোরিকশাচালকের মেয়ে তখন হয়ে উঠেছিলেন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমগ্র মহারাষ্ট্রে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল।
বাবার গর্ব ও সংগ্রাম
আদিবা আনামের বাড়ি মহারাষ্ট্রের ইয়াভতমাল জেলায়। কৃষকদের আত্মহত্যা এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জন্য ইয়াভতমাল প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে আসে। আদিবার বাবা আশফাক আহমেদ শেখ পেশায় একজন অটোরিকশাচালক এবং মা গৃহিণী। তাঁর দুই ছোট ভাই রয়েছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সবসময়ই ছিল সাধারণ।
চরম আর্থিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই আদিবা কর্মকর্তা হয়েছেন। গর্বে বুক ভরে ওঠা বাবা আশফাক বলেন, “সুবহ রোশন হ্যায়, শাম রোশন হ্যায়... জিন্দেগি কা নিযাম রোশন হ্যায়। লোগ বেটোঁ পে নাজ করতে হ্যায়, মেরা বেটি সে নাম রোশন হ্যায়...” অর্থাৎ, “সকাল উজ্জ্বল, সন্ধ্যাও উজ্জ্বল। জীবনের ব্যবস্থাও উজ্জ্বল। মানুষ ছেলেদের নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু আমার নাম উজ্জ্বল হয়েছে আমার মেয়ের কারণে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কখনও ছেলে ও মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করিনি। ছোটবেলা থেকেই আমার মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। তখনই আমি তার এই গুণ চিনতে পেরেছিলাম। তাই তাকে ভালো শিক্ষা দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে নিজের পরিস্থিতির সঙ্গেও লড়াই করেছি।”
আশফাক আরও বলেন, “এই জায়গায় পৌঁছানো পর্যন্ত আদিবার পথ মোটেও সহজ ছিল না। আমাদের সবাইকে অনেক মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে। সমাজের নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি সেসবকে গুরুত্ব দিইনি। তার শিক্ষার পথে কখনও বাধা আসতে দিইনি। তাকে পড়াশোনা করিয়ে একজন কর্মকর্তা বানানোই ছিল আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”
আদিবা আনম
শিক্ষা ও ইউপিএসসি-র পথে যাত্রা
আদিবা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন জাফরনগরের জেলা পরিষদ উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ইয়াভতমালের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বিশেষ করে গণিতে তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পুনেতে চলে যান এবং আজম ক্যাম্পাস থেকে গণিতে স্নাতক (বি.এসসি) ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্নাতক পড়ার সময়ই তাঁর মনে সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায়। তিনি উপলব্ধি করেন, “সমাজে পরিবর্তন আনতে কিংবা মানুষের সমস্যার সমাধান করতে চাইলে সিভিল সার্ভিস একটি অসাধারণ মাধ্যম।” পরবর্তীতে তিনি সর্বভারতীয় স্তরে ১৪২তম স্থান অর্জন করে চতুর্থ প্রচেষ্টায় এই অসামান্য সাফল্য লাভ করেন।
পরিবারের সমর্থন ও পুনের সংগ্রামের দিনগুলো
পরিস্থিতির কারণে আদিবার বাবা নিজের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তবে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে তাঁর সন্তানদের যেন সেই কষ্ট ভোগ করতে না হয়। পরিবারের কাছে শিক্ষাই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি কখনও দারিদ্র্যের আঁচ মেয়ের স্বপ্নকে স্পর্শ করতে দেননি।
আবেগাপ্লুত হয়ে আদিবা বলেন, “আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ থাকলেও আমার বাবা-মা কখনও আমাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বলেননি। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন চাকরি করার জন্য। আমার আশেপাশের অনেক ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করতে শুরু করেছিল বা পড়ার পাশাপাশি কাজ করত। কিন্তু আমার বাবা-মা কখনও আমাকে চাকরির জন্য চাপ দেননি।”
স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার জন্য আদিবা পুনেতে আসেন। একটি ছোট শহর থেকে বড় শহরে এসে একা থাকা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। খাবার, বাসস্থান, যাতায়াত, সবকিছু নিজেকেই সামলাতে হয়েছে। পরিবারের থেকে দূরে থাকার কষ্টের পাশাপাশি ছিল পড়াশোনার চাপ।
এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবার সবসময় তাঁর পাশে থেকেছে এবং তাঁকে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। আদিবা বলেন, “আমরা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাস করি। কিন্তু আমার পরিবার কখনও ছেলে-মেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ করেনি। আমার দুই ভাইয়ের মতোই আমাকে ভালোবাসা ও স্নেহে বড় করেছে। বরং সবসময় বড় স্বপ্ন দেখতে এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তা পূরণ করতে শিখিয়েছে।”
ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের পথে
এই যাত্রায় ব্যর্থতাও ছিল। প্রথম দুই প্রচেষ্টায় তিনি সফল হতে পারেননি। একবার সাক্ষাৎকার পর্যন্ত পৌঁছেও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। আবার নতুন করে শুরু করেন। সেই সময় আর্থিক চাপ বহন করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
পরবর্তীতে তিনি হাজ হাউস আইএএস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং দিল্লির জামিয়া রেসিডেন্সিয়াল কোচিং অ্যাকাডেমিতে (আরসিএ) ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকনির্দেশনা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ান।
আইএএস হওয়ার যাত্রার একটি আকর্ষণীয় ঘটনার কথা উল্লেখ করে আদিবা বলেন, সাক্ষাৎকার পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব যাচাই করা হয়। বোর্ড তাঁর পারিবারিক পটভূমি এবং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। বিশেষভাবে জানতে চাওয়া হয়েছিল, একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চান। নিজের স্পষ্ট চিন্তাভাবনা ও আত্মবিশ্বাসী উত্তর দিয়ে তিনি বোর্ডের ওপর গভীর ছাপ ফেলতে সক্ষম হন।
অবশেষে তিনি সব ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করে আইএএস কর্মকর্তা হন। ধারাবাহিকতা ও নিয়মিত পড়াশোনা তাঁর সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি ছিল। প্রতিদিন তিনি ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। সংবাদপত্র পড়া এবং নিজস্ব নোট তৈরি করা ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আদিবা আনম একটি অনুষ্ঠানে
তরুণীদের উদ্দেশে আদিবার বার্তা
আদিবার মতে, যে কোনও ধরনের সাফল্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকতা ও ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য পূরণ করতে চারবার চেষ্টা করা আসলে আমার ধৈর্যেরই পরীক্ষা ছিল। তবে সব সময় ধৈর্য ধরে থাকা ঠিক নয়। কারণ অনেক সময় এমন পরিস্থিতি আসে, যখন কারও সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে আর আমরা শুধু দেখছি। তখন ধৈর্য ধরার বদলে প্রতিবাদ করা উচিত।”
আদিবার সাফল্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের জন্য এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বড় স্বপ্ন দেখা মেয়েদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “গ্রামের ছাত্রীদের আমি বলতে চাই, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, সবসময় বড় স্বপ্ন দেখো। কখনও শিক্ষার পথ থেকে সরে যেও না। সমাজে বা চারপাশে কী ঘটছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তোমার লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট। কঠোর পরিশ্রম করো, ধারাবাহিক থেকো এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। সাফল্য অবশ্যই তোমার হবে।”
তিনি আরও বলেন, “চাঁদে পৌঁছানোর লক্ষ্য স্থির করো, তবেই তারার কাছে পৌঁছতে পারবে। জীবনে কিছু অর্জন করতে চাইলে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখো। জীবনে একটি লক্ষ্য থাকা দরকার, যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ তোমাকে তোমার মহৎ কাজের জন্য স্মরণ করে।”
সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে আদিবা এখন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য, বিশেষ করে কন্যাশিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে চান। অসংখ্য প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একেবারে সাধারণ পরিবারের একটি মেয়েও একদিন জেলা শাসক বা কালেক্টর হতে পারে।