নাসিরুদ্দিন আহমেদ
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার দাদপুরের পুইনানে ২-৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এ বছরের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। সুদীর্ঘ তিন দশক পর পুনরায় বাংলার মাটিতে বিশ্ব মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এই ইসলামিক মহা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। দিল্লির হযরত নিজামুদ্দিন মারকাজের প্রধান তথা বিশ্বনেতা মাওলানা সাদ কান্ধলবি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মগুরু ও গুণীজনরা এখানে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
ইজতেমার আক্ষরিক অর্থ হলো একত্রিত হওয়া বা সমবেত হওয়া। বিশ্ব ইজতেমার প্রধান বার্তা হল বিশ্বশান্তি। মহান আল্লাহতালার উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস রেখে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর নীতি নির্দেশনা অনুসরণ করার পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের আদর্শকে বিশ্বব্যাপী প্রচার করাই ইহার মূল উদ্দেশ্য।
বিশ্ব ইজতেমা ২০২৬ এর পোস্টার
এই বিশাল মুসলিম মহা সম্মেলন গোটা ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের শতাধিক দেশের লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এক মিলনতীর্থ। এক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে ইহা সম্পন্ন হয়। এটি বিশ্বব্যাপী তাবলিগ জামাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মহা সম্মেলন। ইসলামের পবিত্র বার্তা দেশ-বিদেশ থেকে আগত মুসল্লিদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আধ্যাত্মিকতার বার্তা বহন করে। এখানে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো বক্তৃতার মাধ্যমে প্রচার করা হয়।
ইহার মূল বার্তা হল, ঈমান (বিশ্বাস) ও তাকওয়া (খোদা ভীতি) অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভয় ও ঈমানের দৃঢ়তা অর্জন। নবী (সা.)-এর জীবন পদ্ধতি মেনে চলার পাশাপাশি ইসলামের বাণী বিশ্বের সকল প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া ইহার মূল উদ্দেশ্য। আখেরাত (পরকাল) এর জবাবদিহির কথা স্মরণ করে জীবন যাপন করা প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর মিলন ও পারস্পরিক ভালোবাসা ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এর মূল লক্ষ্য। দেশ-বিদেশের আলেম ও গুণীজনরা ইজতেমায় কোরআন ও হাদিসের আলোকে বক্তৃতা প্রদান করেন। মুসল্লিরা ইজতেমার মাঠ থেকে দাওয়াতি কাজে বেরিয়ে পড়েন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে এসে ধর্মীয় জ্ঞান আহরণ করতে এখানে আলোচনায় অংশ নেন।
বিশ্ব ইজতেমার এক দৃশ্য
ইসলামে ঈমান (মহান আল্লাহর উপর সুদৃঢ় বিশ্বাস) হল সর্বোচ্চ ও মৌলিক ভিত্তি। ঈমান ছাড়া ইসলামে কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব:
(১) ঈমানই মুসলমান হওয়ার মূল শর্ত
ঈমান ছাড়া কেউ মুসলমান হতে পারে না। আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও দ্বীনের মূল বিষয়ের ওপর বিশ্বাসই একজন মানুষকে মুসলমান বানায়। “যে ব্যক্তি ঈমান আনল ও সৎকর্ম করল, তাদের জন্যই রয়েছে সফলতা।” (সূরা আল-মু’মিনূন: ১–২)
(২) ঈমান ছাড়া আমল গ্রহণযোগ্য নয়
নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, সব আমলই ঈমানের ওপর নির্ভরশীল। ঈমান না থাকলে আমলের কোনো মূল্য নেই। “যে ব্যক্তি কুফরি অবস্থায় মারা গেল, তার সব আমল নষ্ট হয়ে গেল।” (সূরা আল-বাকারা: ২১৭)
(৩) ঈমান মানুষকে সঠিক পথ দেখায়
ঈমান মানুষকে হারাম থেকে বাঁচায়, হালালের পথে চালিত করে এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। “নিশ্চয়ই ঈমানদাররাই সফলকাম।” (সূরা আল-মু’মিনূন: ১)
(৪) ঈমান অন্তরের প্রশান্তি আনে
আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদেও মানুষ ধৈর্য ধরে থাকতে পারে। “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রা’দ: ২৮)
(৫) ঈমানই জান্নাতে প্রবেশের চাবিকাঠি
ঈমান ছাড়া জান্নাত লাভ সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহিহ মুসলিম)
(৬) ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়
ইবাদত, জিকির ও নেক আমলে ঈমান বৃদ্ধি পায়; গুনাহে ঈমান দুর্বল হয়। “যাতে তারা তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি করতে পারে।” (সূরা আল-ফাতহ: ৪)
(৭) ঈমান আখিরাতের সফলতার ভিত্তি
কবর, হাশর, মিজান ও আখিরাতের সব ধাপে সফলতা নির্ভর করে ঈমানের ওপর। সংক্ষেপে বলা যায়, ঈমান হলো হৃদয়ের আলো, জীবনের পথপ্রদর্শক ও আখিরাতের মুক্তির মূল চাবিকাঠি।
বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে একত্রিত হওয়া লোকেরা
ইসলামে তাকওয়ার গুরুত্ব:
ইসলামে তাকওয়া (আল্লাহকে ভয় করা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি গুণ। তাকওয়া ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণ হয় না এবং তাকওয়াই একজন মুমিনের চরিত্র ও জীবনকে আল্লাহভীতিতে পরিচালিত করে।
** তাকওয়া আল্লাহর নিকট মর্যাদার মানদণ্ড। মানুষের মর্যাদা বংশ, সম্পদ কিংবা পদমর্যাদায় নয়, বরং তাকওয়ার মধ্যেই নিহিত। “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
** তাকওয়া আল্লাহর আদেশ মানতে শক্তি দেয়। তাকওয়া মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচায়, হারাম থেকে দূরে রাখে এবং হালাল পথে পরিচালনায় সাহায্য করে।
** তাকওয়া দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার চাবিকাঠি। তাকওয়াবানদের জন্য আল্লাহ বিশেষ সাহায্য ও কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন।” (সূরা আত-তালাক: ২)
** তাকওয়া অন্তরের পবিত্রতা আনে, তাকওয়া হৃদয়কে অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করে। “তাকওয়া তো অন্তরের বিষয়।” (সহিহ মুসলিম)
** তাকওয়া ইবাদতের প্রাণ, নামাজ, রোজা, যাকাতসহ সব ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করো।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
** তাকওয়া আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম, আল্লাহ তাকওয়াবানদের ভালোবাসেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকওয়াবানদের ভালোবাসেন।” (সূরা আত-তাওবা: ৪)
** তাকওয়া আখিরাতে মুক্তির নিশ্চয়তা, তাকওয়াবানদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত। “জান্নাত তাকওয়াবানদের জন্য নিকটে আনা হবে।” (সূরা আশ-শু‘আরা: ৯০)
বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে নির্মিত জাপানের শিবির
এক কথায় তাকওয়া হলো, আল্লাহভীতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করা, প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর আদেশ মানা এবং গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
ইসলামে লজ্জার গুরুত্ব :
ইসলামে লজ্জা (হায়া) হলো এমন একটি অন্তরের গুণ, যা মানুষকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখে।
** লজ্জা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসূলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, “লজ্জা ঈমানের একটি অংশ।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
** লজ্জা ঈমানকে সুরক্ষা দেয়। যার মধ্যে লজ্জা আছে, সে সহজে গুনাহে (পাপকর্মে) লিপ্ত হয় না। “লজ্জা ও ঈমান একসঙ্গে থাকে; একটিকে তুলে নিলে অন্যটিও উঠে যায়।” (হাদিস)
** লজ্জা সব কল্যাণের উৎস। রাসূল (সা.) বলেছেন, “লজ্জা কেবল কল্যাণই নিয়ে আসে।” (সহিহ মুসলিম)
** আল্লাহর প্রতি লজ্জা- প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করে চলাই হলো প্রকৃত লজ্জা।
** মানুষের প্রতি লজ্জা- ভদ্রতা, শালীনতা ও শিষ্টাচার বজায় রাখা লজ্জার অংশ।
** লজ্জাহীনতার পরিণতি- লজ্জা না থাকলে মানুষ যেকোনো পাপে লিপ্ত হতে পারে। “তোমার মধ্যে লজ্জা না থাকলে যা খুশি তাই কর।” (সহিহ বুখারি) এক কথায় লজ্জা হলো ঈমানের সৌন্দর্য, চরিত্রের অলংকার এবং গুনাহ থেকে রক্ষার ঢাল।
বিশ্ব ইজতেমায় বিশ্ববাসীকে মূলত মানবতা, শান্তি ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর বার্তা দিয়েছে। বার্তাগুলো হলো:
ঈমান ও আত্মশুদ্ধি: আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, নামাজ, জিকির ও আমলের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার আহ্বান।
শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব: জাতি, ভাষা ও দেশের সীমা পেরিয়ে সবাই যে এক, এই বোধ জাগ্রত করা। হিংসা-বিদ্বেষ ছেড়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন: সততা, আমানতদারি, বিনয় ও উত্তম আখলাক গড়ে তোলার গুরুত্ব।
মানবতার সেবা: মানুষের উপকার করা, দুঃখী-অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, এটাই প্রকৃত ইবাদতের অংশ।
দাওয়াত ও দ্বীনি দায়িত্ব: নিজে সঠিক পথে চলা এবং পরিবার-সমাজকে কল্যাণের পথে ডাকার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
ঐক্য ও উম্মাহর সংহতি: ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা।
বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা: নিজেকে বদলাও, মানুষকে ভালোবাসো, শান্তির পথে চলো।