শান্তি-সম্প্রীতির আবহে পশ্চিমবঙ্গে পালিত মহরম, রাজ্যজুড়ে শোকমিছিল ও ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
শান্তি-সম্প্রীতির আবহে পশ্চিমবঙ্গে পালিত মহরম, রাজ্যজুড়ে শোকমিছিল ও ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ
শান্তি-সম্প্রীতির আবহে পশ্চিমবঙ্গে পালিত মহরম, রাজ্যজুড়ে শোকমিছিল ও ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্মরণ
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী / কলকাতা

শুক্রবার পবিত্র মহরম উপলক্ষে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম শোকাবহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। রাজ্যের সর্বত্র ছিল শোক, সংযম, আত্মত্যাগের আদর্শ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বার্তা। কলকাতা, চন্দননগর, মহেশতলা, মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি সংলগ্ন এলাকা-সহ বিভিন্ন জেলায় তাজিয়া মিছিল, মাতম, মর্সিয়া পাঠ এবং কারবালার বীর শহিদদের স্মরণে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়।
 
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহরম। এই মাসের ১০ তারিখ, আশুরার দিন, কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই দিনটির তাৎপর্য। তাই মহরম আনন্দের নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগ এবং ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়।
 
শান্তি-সম্প্রীতির আবহে পশ্চিমবঙ্গে পালিত মহরম
 
রাজধানী কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের হয়। শোকমিছিলে অংশ নেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। ধর্মীয় শোকগীতি, মাতম এবং কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস স্মরণে পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন। অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে কলকাতা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি যানজট এড়াতে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয়।
 
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় বৃহৎ তাজিয়া মিছিল। বিভিন্ন ইমামবাড়া থেকে বের হওয়া শোকযাত্রায় অংশ নেন সব বয়সের মানুষ। মাতম, ধর্মীয় সঙ্গীত এবং কারবালার শহিদদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় মহরম। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
 
ঐতিহ্যবাহী শহর চন্দননগরেও সুসংগঠিত শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাস্তার দু'ধারে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ তাজিয়া মিছিল প্রত্যক্ষ করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থাও করা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের কাছে প্রশংসিত হয়।
 
মুর্শিদাবাদে, বিশেষ করে ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারি প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকায়, মহরম পালন ঘিরে ছিল বিশেষ উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য। জেলার বিভিন্ন ইমামবাড়া থেকে তাজিয়া বের হয়। কারবালার ঘটনার স্মরণে ধর্মীয় আলোচনা, মর্সিয়া পাঠ এবং মাতম অনুষ্ঠিত হয়। নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই জেলার মহরম পালনের বিশেষ সংস্কৃতি আজও সমানভাবে মানুষের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।
 
এছাড়াও হাওড়া, আসানসোল, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, নদিয়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে মহরম পালিত হয়। বহু জায়গায় হিন্দু, মুসলিম-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে সহযোগিতা করে সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কোথাও পানীয় জল বিতরণ, কোথাও চিকিৎসা শিবির, আবার কোথাও স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতা উৎসবের সামাজিক দিকটিকেও তুলে ধরে।
 
রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম নিরাপত্তা, নজরদারি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছিল। বিভিন্ন জেলায় পুলিশ, সিভিল ডিফেন্স এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা সারাদিন পরিস্থিতির উপর নজর রাখেন। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় কোনও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর মেলেনি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে মহরমের সমস্ত কর্মসূচি।
 
শোকের এই পবিত্র দিনে পশ্চিমবঙ্গ আবারও সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সামাজিক ঐক্যের বার্তাও ছড়িয়ে পড়ল রাজ্যের সর্বত্র।