গুরুগ্রামের ‘বুলডোজার ম্যান’-এর অভিনব উদ্যোগঃ পরিচ্ছন্নতা ও সম্প্রীতির এক অনন্য নজির

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 h ago
ঈদের দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হরিয়ানা শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটিপি (এনফোর্সমেন্ট) তথা নোডাল অফিসার আর এস বাথ
ঈদের দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হরিয়ানা শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটিপি (এনফোর্সমেন্ট) তথা নোডাল অফিসার আর এস বাথ
 
মালিক আসগর হাশমি / গুরুগ্রাম (হরিয়ানা)

হরিয়ানার ‘মিলেনিয়াম সিটি’ গুরুগ্রাম। আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, ব্যস্ত কর্পোরেট সংস্কৃতি এবং ঝলমলে লাইফস্টাইলের জন্য এই শহর সবার পরিচিত। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই মাঝেমধ্যে শুক্রবারের জুম্মার নামাজকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণেও শহরটি সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার শিরোনাম দখল করে। তবে এবার গুরুগ্রাম আলোচনায় এসেছে একেবারেই ভিন্ন এবং ইতিবাচক কারণে। এবার শহরটির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে কোনও পুরনো বিতর্ক বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জন্য নয়, বরং পারস্পরিক সমন্বয়, পরিচ্ছন্নতা এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের এক সুন্দর উদাহরণের জন্য। আসন্ন বকরিদ এবং প্রতি শুক্রবারের জুম্মার নামাজ যাতে কোনও বাধা বা বিতর্ক ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ মিলে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন হরিয়ানা শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটিপি (এনফোর্সমেন্ট) তথা নোডাল অফিসার আর এস বাথের এক অর্থবহ উদ্যোগ।
 
মসজিদের অভাব এবং খোলা মাঠের বিকল্প

জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে গুরুগ্রামে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট হলেও, সেই অনুপাতে শহরের মধ্যে পর্যাপ্ত মসজিদের অভাব রয়েছে। এর ফলেই কর্পোরেট ক্ষেত্র এবং অন্যান্য পেশায় কর্মরত হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারে, ফুটপাথ বা সরকারি পার্কে জুম্মার নামাজ পড়তেন। রাস্তার ধারে নামাজ পড়ার ফলে শহরে প্রায়ই যানজট এবং অন্যান্য স্থানীয় সমস্যার সৃষ্টি হতো।
 
ঈদের দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হরিয়ানা শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটিপি (এনফোর্সমেন্ট) তথা নোডাল অফিসার আর এস বাথ
 
এই প্রশাসনিক ও সামাজিক সমস্যাগুলির দিকে নজর রেখে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে রাজ্য সরকার খোলা জায়গায় এভাবে নামাজ পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে সরকার এবং প্রশাসন এর একটি বাস্তবসম্মত বিকল্পও বের করে। কর্পোরেট কর্মী এবং সাধারণ নামাজিদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার জন্য সেক্টর ২৯-এর হুডা সিটি সেন্টার মেট্রো স্টেশনের (বর্তমান মিলেনিয়াম সিটি সেন্টার) ঠিক পিছনে থাকা প্রায় ৪০ একরের একটি বড় সরকারি খেলার মাঠের একাংশ নামাজের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। তখন থেকেই প্রতিটি ঈদ, বকরিদ এবং জুম্মার নামাজ এখানেই শান্তিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে আসছে।
 
আবর্জনার সমস্যা এবং প্রশাসনের সাড়া

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খেলার মাঠটির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব চোখে পড়তে শুরু করে। নামাজের সময় বিপুল ভিড়ের কারণে সেখানে প্রচুর আবর্জনা জমতে থাকে। মাঠটির তদারকি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেখানে ময়লার স্তূপ জমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে আসা কিছু সচেতন মুসলিম নিজেই এগিয়ে এসে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা সরাসরি HSVP-র ডিটিপি (এনফোর্সমেন্ট) বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মাঠটি পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা চান।
 
সাধারণ মানুষের এই ইতিবাচক মানসিকতাকে ডিটিপি এনফোর্সমেন্ট বিভাগও খোলা মনে স্বাগত জানায়। নোডাল অফিসার আর এস বাথ সঙ্গে সঙ্গেই এই অনুরোধ মঞ্জুর করেন এবং তাঁর দলকে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেন। এই পুরো অভিযানের বাস্তবায়ন এবং নামাজি ও সরকারি কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিভাগের আরেক কর্মঠ কর্মকর্তা রাম আর্য।
 
পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নিজেই অংশগ্রহণ করার মুহূর্তে আর এস বাথ
 
“শহর পরিষ্কার রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব”

এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডিটিপি এবং নোডাল অফিসার আর এস বাথ নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “গুরুগ্রামের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের শহর পরিষ্কার এবং দখলমুক্ত রাখা শুধু প্রশাসনের কাজ নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকেরও নৈতিক দায়িত্ব। যখন সাধারণ মানুষ নিজেরাই শহরের স্বার্থে এগিয়ে আসে, তখন আমাদের বিভাগ এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে কখনও দ্বিধা করে না।”
 
আর এস বাথ জানান, যখন সেক্টর ২৯-এর হুডা গ্রাউন্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন তিনি নিজেকে শুধু অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি। তিনি নিজেই গ্রাউন্ড জিরোতে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তা ও নামাজিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজের হাতে আবর্জনা পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যখন এভাবে নিজেই কাজে নেমে পড়েন, তখন প্রশাসনের উপর মানুষের বিশ্বাস আরও মজবুত হয়।
 
ঈদের নামাজের সময় সকলের একত্রিত হওয়ার দৃশ্য
 
দখলদার এবং ফুটপাত ব্যবসায়ীদের কড়া সতর্কবার্তা

মাঠটির বাস্তব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আর এস বাথ বলেন, শুক্রবারের জুম্মা বা ঈদের সময় এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। এই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাঠের চারপাশে বিরিয়ানি, চা-নাস্তা এবং অন্যান্য খাবারের দোকান বসে। ধীরে ধীরে এই ব্যবসায়ীরা মাঠের কোণাগুলি স্থায়ীভাবে দখল করার চেষ্টা করে এবং আবর্জনাও সেখানেই ফেলে রাখে।
 
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় প্রশাসন এমন সব ঠেলাগাড়ি ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কঠোর সতর্কবার্তা দেয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অজুহাতে সরকারি জমিতে যাতে কোনও ধরনের অবৈধ দখল না হয়, সে বিষয়ে তাঁদের বোঝানো হয়। পাশাপাশি নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে পড়ে থাকা ডিসপোজেবল সামগ্রী এবং আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাথ আরও স্পষ্ট করে জানান যে শহরের অন্যান্য ধর্মীয় স্থান, যেমন মন্দির এবং গুরুদ্বারের আশপাশের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও প্রশাসন সমানভাবে কঠোর। মন্দিরের কাছে যাতে অবৈধভাবে মাংসের দোকান চালানো না যায়, তার জন্য কঠোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
 
ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের সঙ্গে আর এস বাথ
 
‘বুলডোজার ম্যান’-এর নতুন রূপে মুগ্ধ সোশ্যাল মিডিয়া

গুরুগ্রামের প্রশাসনিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আর এস বাথ ‘বুলডোজার ম্যান’ নামে পরিচিত। শহরের কোথাও অবৈধ নির্মাণ বা সরকারি জমি দখলের অভিযোগ পেলেই তিনি নিজের বুলডোজার নিয়ে সেখানে পৌঁছে যান। প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা তাঁর নিত্যদিনের কাজের অংশ।
 
তাই যখন তাঁর এই ‘ইতিবাচক’ এবং ‘সহযোগিতামূলক’ রূপ সামনে আসে, তখন শহরবাসী যেমন অবাক হয়, তেমনই আনন্দিতও হয়। আর এস বাথ তাঁর সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যার পরই ইন্টারনেটে মন্তব্যের ঢল নামে। ভিডিওটির সঙ্গে তিনি লিখেছেনঃ
 
“মুসলিম সমাজ সেক্টর ২৯-এ প্রতি শুক্রবার নামাজের পর একটি বড় খেলার মাঠ পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিয়েছে এবং HSVP বিভাগের সহযোগিতাও চেয়েছে। JE রামপাল জি সমন্বয় রক্ষা করছেন এবং এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে আমিও উপস্থিত হয়েছি।
 
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের দৃশ্য
 
এর পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ এও বলেছে যে দখল করা উচিত নয়। গুরুগ্রাম এমন এক অনন্য উদাহরণ যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং মত বিনিময়ের পাশাপাশি আইন প্রয়োগও এক আদর্শ হয়ে উঠেছে। নিজের শহরকে ভালোবাসুন এবং একে সুন্দর করে তুলুন।
 
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার ঢল

ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অফিসারের কাজের ধরন এবং এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মানুষ ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
 
শ্বেতা সিং নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “স্যার, আপনার কাজ করার ধরন আমার খুব ভালো লাগে। আপনি সবসময় গুরুগ্রামেই থাকবেন।” অন্যদিকে, দেশ বদলানোর প্রসঙ্গ টেনে ওয়াকার নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “নিশ্চয়ই, দেশ বদলাতে হলে নিজেকেও বদলাতে হবে, পরিচ্ছন্নতার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।” মহম্মদ সাকিব মন্তব্য করেছেন, “আজ একটা স্যালুট প্রাপ্য স্যার।”
 
 
অন্যদিকে, সাহির তাঁকে একজন ‘সৎ অফিসার’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে কিছু মানুষ শহরের অন্যান্য সমস্যার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আদিল নামে এক ব্যবহারকারী সামাজিক প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, “গরিব মানুষরাই কেন ব্যবস্থাকে নষ্ট করে?” আবার অন্য একাংশ দিল্লির স্বরূপ নগর এবং গুরুগ্রামের সেক্টর ৪৩-এর বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যবসায়ীদের করা অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবিও তুলেছেন।
 
নিঃসন্দেহে গুরুগ্রামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশের অন্যান্য শহরের জন্যও এক অনুপ্রেরণা। সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর আইন এবং প্রশাসনের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু যখন প্রশাসন সাধারণ মানুষকে বিশ্বাসে নেয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এগিয়ে যায়, তখন সমাজের যেকোনও জটিল সমস্যা বা বিতর্কও মুহূর্তের মধ্যে সম্প্রীতি এবং পরিচ্ছন্নতার এক সুন্দর উৎসবে পরিণত হতে পারে। উচ্ছেদের ‘বুলডোজার’-এর বদলে পরিচ্ছন্নতার ‘ঝাড়ু’ হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনাই প্রমাণ করে দিয়েছে যে সদিচ্ছা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা থাকলে বিভেদের প্রাচীর ভেঙে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সত্যিই সম্ভব।