ধর্মকে ঘিরে মতভেদ, রাজনীতি আর বিভাজনের ভাষা আজকের সমাজে নতুন কিছু নয়। বিশ্বাস যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সেখানে তাকে ঘিরে সংঘাতও তৈরি হয়েছে বারবার। তবু এই সমস্ত কোলাহলের মধ্যেই কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত ধরা পড়ে, যা মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের আসল ভাষা বিভাজন নয়, বরং সহাবস্থান।
এমনই এক দৃশ্য দেখা গেল গঙ্গাসাগরে। পুণ্যস্নানের ভিড়ে অন্যদের মতোই উপস্থিত ছিলেন ফিরোজ বক্স, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আসমিনা বিবি ও সন্তান। পরিচয়ে তাঁরা মুসলিম, কিন্তু বিশ্বাসে সীমারেখা টেনে রাখেন না। হিন্দু রীতিতে গঙ্গাস্নান করতে এসে তাঁদের মনে ছিল না কোনও দ্বিধা বা সংকোচ। বরং স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা মিশে গিয়েছেন সাগরমেলার পরিবেশে। ফিরোজ বক্সের সন্তান হিজাব পরে স্নানে অংশ নেয়, এই দৃশ্য অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে বিস্ময়ের কারণ।
গঙ্গাসাগর মেলার প্রবেশদ্বারের একটি ছবি (ফাইল)
কিন্তু তাঁদের কাছে বিষয়টি একেবারেই সাধারণ। ফিরোজ বক্স জানান, তাঁরা প্রতি বছরই গঙ্গাসাগরে আসেন। এখানেই তাঁদের বাড়ি, এখানকার পরিবেশ তাঁদের চেনা। তাঁর কথায়, “সব ধর্মই এক জায়গায় এসে মেশে। সবাই মানুষ, সবাই ভালবাসে। তাই এখানে এলে মনে শান্তি পাই।”
স্ত্রী আসমিনা বিবিও একই সুরে কথা বলেন। তাঁর মতে, গঙ্গাসাগরে আসা তাঁদের কাছে বিশ্বাসেরই একটি প্রকাশ। মন্দিরে যাওয়া, প্রসাদ গ্রহণ, এসবের মধ্যে তিনি কোনও অস্বাভাবিকতা দেখেন না। তাঁর ভাষায়, “বিশ্বাস তো মনে। এতে আলাদা করে কিছু ভাবার নেই। সবই খুব স্বাভাবিক।”
গঙ্গাসাগর মেলার একটি ছবি (ফাইল)
ধর্মীয় বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের আবহে ফিরোজ বক্স ও তাঁর পরিবারের এই উপস্থিতি তাই আলাদা করে চোখে পড়ে। সমালোচনা, কটাক্ষ কিংবা সামাজিক চাপ, কিছুই তাঁদের বিশ্বাসের পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। মনের টানেই তাঁরা গঙ্গাসাগরে এসেছেন, পুণ্যস্নানে অংশ নিয়েছেন এবং নির্ভারভাবে সেই আনন্দ উপভোগ করেছেন। তাঁদের এই অবস্থান দেখিয়ে দেয়, ধর্ম মানুষের মধ্যে দেয়াল তোলার জন্য নয়, বরং মানুষের মনকে যুক্ত করার জন্য। এই নির্ভার সহাবস্থানের ছবি হয়তো অল্প সময়ের জন্যই ধরা পড়ে, কিন্তু বহু মানুষের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায় এক নীরব অনুপ্রেরণা হয়ে।