রাজস্থানে মুসলিম সমাজের উদ্যোগে যৌতুকমুক্ত ও আড়ম্বরহীন বিবাহের সূচনা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
রাজস্থানের মুসলমান সমপ্রদায়ের আয়োজিত এক বিবাহের দৃশ্য
রাজস্থানের মুসলমান সমপ্রদায়ের আয়োজিত এক বিবাহের দৃশ্য
 
ফারহান ইসরাইলি / জয়পুর

নিকাহ বা বিবাহ কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় বন্ধন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পবিত্র সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজস্থানের মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে কুরেইশি সম্প্রদায়ের মধ্যে, একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ দেখা দিয়েছে। রাজস্থানের কুরেইশি সমাজ বিবাহকে আবার সরলতা ও সুন্নতের পথে ফিরিয়ে আনার এক উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে রাজস্থানের মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে কুরেইশি সম্প্রদায়, যৌতুকমুক্ত ও আড়ম্বরহীন বিবাহ প্রথা চালুর কথা ভাবছে। এই বিবাহ প্রথার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও ‘গ্র্যান্ড ওয়েডিং’-এর প্রতিযোগিতা বন্ধ করার একটি আন্দোলন শুরু হয়েছে। যেখানে যৌতুক প্রথা, রাতের ভোজ, বিশাল বাগানসদৃশ সাজসজ্জা, এসবের কোনো স্থান নেই। এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শক্তিশালী ফল দেখাতে শুরু করেছে। জয়পুর থেকে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ এখন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষের মানসিকতাতেও পরিবর্তন আনছে।
 
রাজস্থানের মুসলমান সমপ্রদায়ের আয়োজিত এক বিবাহের দৃশ্য
 
এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা, ব্যয়বহুল সাজসজ্জা ও বিশাল ভোজের পরিবর্তে সুন্নত অনুযায়ী সরল ও পবিত্র বিবাহে মানুষকে উৎসাহিত করা। এই উদ্যোগের ভিত্তি স্থাপিত হয় ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর, জয়পুরের ঝোটওয়ারা এলাকায়। প্রবীণ সমাজকর্মী ও ব্যবসায়ী সুত্তন কুরেইশি ঝোটওয়ারার নূরানি মসজিদে নাঈম কুরেইশির (রাজস্থান রাজ্য সভাপতি, অল ইন্ডিয়া জমিয়াতুল কুরেইশ) পুত্রের সঙ্গে তাঁর কন্যা আলিমার বিবাহ অত্যন্ত সহজ পদ্ধতিতে সম্পন্ন করেন। এই বিবাহে ছিল না কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা, না কোনো ব্যয়বহুল বাগান, না বিশাল ভোজের আয়োজন।
 
এই বিবাহ স্পষ্টভাবে এই বার্তা দিয়েছে যে, বিবাহ কোনো প্রতিযোগিতা বা প্রদর্শনের বিষয় নয়; বরং সম্পর্কের পবিত্রতা ও পরিবারের সুবিধা-অসুবিধাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়াই প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই উপলক্ষে অল ইন্ডিয়া জমিয়াতুল কুরেইশের জাতীয় সভাপতি সিরাজ আহমেদ কুরেইশিও উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক বলে অভিহিত করে বলেন, “এটি প্রথাগত চিন্তাধারার পরিবর্তনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক আদর্শ উদাহরণ।”
 
এই আন্দোলনের আয়োজন ও প্রসারে ইসলাাহে মাশরা সমিতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সমিতির লক্ষ্য হলো, যৌতুক দাবি, গভীর রাতে ডিজে সংগীত, ব্যয়বহুল ভোজ এবং বিবাহ বাগানে অতিরিক্ত খরচের মতো সামাজিক কু-সংস্কার বন্ধ করা। কমিটির সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝাচ্ছেন যে, সরলতা ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে বিবাহ আয়োজন করাই প্রকৃত আদর্শ।
 
সাম্প্রতিক সময়ে এই উদ্যোগের প্রভাব তৃণমূল স্তরেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি এম ডি রোডের অঞ্জুমের সঙ্গে ঝোটওয়ারার বাসিন্দা মেরাজ কুরেইশির পুত্র সোহেল-এর বিবাহ মসজিদ কুরেইশিয়ানে অনুষ্ঠিত হয়। এই বিবাহে কোনো রাজকীয় ভোজ বা জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা ছিল না। অতিথিদের কেবল খেজুর ও সাধারণ মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এই সরল বিবাহ প্রথা এক শক্তিশালী বার্তা দেয়, বিবাহের পবিত্রতা ও সম্পর্কের গুরুত্ব কোনোভাবেই বস্তুগত প্রদর্শনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
 
রাজস্থানের মুসলমান সমপ্রদায়ের আয়োজিত এক বিবাহের দৃশ্য

একইভাবে, ৮ জানুয়ারি ঝোটওয়ারার নূরানি মসজিদে আরেকটি সাধারণ বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। মেরাজ কুরেইশির কন্যা শেহনাজ ও জহিরুদ্দিনের পুত্র জুনাইদের বিবাহ জুহরের নামাজের পর শরিয়ত অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। এখানেও অতিথিদের কেবল খেজুর ও হালকা সতেজ খাদ্য দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়; কোনো ধরনের জাঁকজমক বা ব্যয়বহুল ভোজের আয়োজন ছিল না।
 
এই আন্দোলন তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে:

যৌতুক নয়: কন্যাসন্তানের আত্মসম্মান রক্ষা এবং দরিদ্র পরিবারকে ঋণ ও আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া।
 
রাতের ভোজ নয়: রাতের ভোজ ও খাদ্যের অপচয় বন্ধ করা।
 
বাগানসদৃশ সাজসজ্জা নয়: ব্যয়বহুল বিবাহ বাগানের পরিবর্তে মসজিদে বিবাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
 
কুরেইশি সম্প্রদায়ের এই উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ প্রমাণিত হয়েছে। এটি নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছে যে সরলতা, বিশ্বাস ও সম্পর্কের পবিত্রতাই সমাজের প্রকৃত পরিচয়। এই প্রচেষ্টার ফলে শুধু অপ্রয়োজনীয় খরচ ও আড়ম্বর কমছে না, বরং যুবক-যুবতীরাও অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনছে।
 
সমাজকর্মী ও সমিতির সদস্যদের বিশ্বাস, বিবাহের এই নতুন প্রথা সমগ্র মুসলিম সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। এটি প্রমাণ করেছে যে সম্পর্কের পবিত্রতা, পারিবারিক ভালোবাসা ও সরলতা যেকোনো বস্তুগত প্রদর্শনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। আগামী দিনে কুরেইশি সম্প্রদায়ের এই উদ্যোগ সমগ্র রাজস্থান এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়েও ছড়িয়ে পড়বে, যা যৌতুক, অপচয়মূলক খরচ ও আড়ম্বরহীন বিবাহ সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
 
এইভাবে রাজস্থানের কুরেইশি সম্প্রদায় একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা দেখায় যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে প্রথাগত অনিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে একটি শক্তিশালী ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।