কাঁটাতার কবিকে ভাগ করলেও কবিতাকে পারে না ফটিকরায়ে ষষ্ঠ ফোয়ারা মিলনমেলায় দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির মিলন, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর বার্তা
Story by Nurul Haque | Posted by Aparna Das • 17 h ago
কাঁটাতার কবিকে ভাগ করলেও কবিতাকে পারে না ফটিকরায়ে ষষ্ঠ ফোয়ারা মিলনমেলায় দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির মিলন, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর বার্তা
নূরুল হক / আগরতলা
কাঁটাতার দিয়ে ভূখণ্ডকে ভাগ করা যায়, কিন্তু ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের হৃদয়ের বন্ধনকে কখনও ভাগ করা যায় না। দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় এই চিরন্তন সত্যই যেন নতুন করে উঠে এল ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার ফটিকরায়ে। সম্প্রতি ত্রিপুরার ফটিকরায় ক্লাস টুয়েলভ স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ষষ্ঠ "ফোয়ারা মিলনমেলা।" কবিতা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য এবং মননশীল আলোচনার মধ্য দিয়ে এই মিলনমেলা হয়ে উঠল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং সাংস্কৃতিক মৈত্রীর এক অনন্য মঞ্চ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা সরকারের মন্ত্রী সুধাংশু দাস। ছিলেন ফটিকরায় ক্লাস টুয়েলভ স্কুলের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণরঞ্জন পাল। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা থেকে আগত কবি ড. অমিত চ্যাটার্জি। পাশাপাশি গুয়াহাটি থেকে এসেছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম। তবে এবারের মিলনমেলার অন্যতম অতিথি এবং আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের ভৈরব থেকে আগত বরিষ্ঠ কবি ড. শহীদুল্লাহ। তাঁর উপস্থিতি দুই বাংলার সাহিত্যিকদের এই মিলনমেলায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে দেয়।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ধর্মনগর থেকে আগত জাতীয় লোকসংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি, লোকগবেষক ও কবি মন্টু দাস, কবি নিবারণ নাথ, কবি তথা আইনজীবী হৃষিকেশ নাথ, আগরতলার রসগল্পকার ও আইনজীবী রাখাল মজুমদার, রাজর্ষি কলেজের অধ্যক্ষ তথা কবি ড. মুজাহিদ রহমান, ড. নির্মল দেবনাথ এবং ত্রিপুরা বাংলা একাডেমির কর্ণধার কবি কৃষ্ণকুসুম পাল। কুমারঘাট থেকে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি নীলিমা দাশগুপ্ত, গোপাল চন্দ্র দাস ও অনিতা ভট্টাচার্যী। ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সাহিত্য অনুরাগী মানুষের সমাগমে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত।
অনুষ্ঠানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও দর্শনকে কেন্দ্র করে মানবতাবাদ এবং সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে ফোয়ারা সাহিত্যপত্রের নতুন সংখ্যা উন্মোচন করা হয়। পত্রিকার সম্পাদক কবি আলাল উদ্দিনের উদ্যোগে প্রকাশিত এই সংখ্যায় নজরুলের মানবতাবাদী চিন্তা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার দর্শন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
"ফোয়ারা মিলনমেলা।"
সম্পাদক আলাল উদ্দিনের ভাবনায় উঠে এসেছে এমন এক সমাজের স্বপ্ন, যেখানে ধর্মীয় বিভাজন নয়, মানবতাই হবে মানুষের পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, দুই বাংলার মানুষ একই ভাষার উত্তরাধিকার বহন করেন। তাঁরা সবাই বাঙালি। সীমান্ত কবিকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু কবিতাকে ভাগ করতে পারে না।
তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে বিশেষ আবেগের সঞ্চার করে। দুই দেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার বার্তা বহন করে তাঁর বক্তব্য। এছাড়াও ষষ্ঠ ফোয়ারা মিলনমেলায় ফোয়ারা সাহিত্য পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ মানপত্র ও সম্মাননা প্রদান করা হয় মন্ত্রী সুধাংশু দাস এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণরঞ্জন পালকে।
বাংলাদেশের বরিষ্ঠ কবি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে দেওয়া সম্মান
সাহিত্যিকদের মধ্যে সম্মানিত করা হয় কলকাতার কবি ড. অমিত চ্যাটার্জি, গুয়াহাটির লেখিকা মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম, ধর্মনগরের কবি নিবারণ নাথ, আগরতলার কবি কৃষ্ণকুসুম পাল এবং বাংলাদেশের বরিষ্ঠ কবি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। বাংলাদেশের কবি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে সম্মান জানানোর সময় সম্পাদক আলাল উদ্দিন ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী রিসা পরিয়ে তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেন। এই সম্মাননা শুধু একজন কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ত্রিপুরার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্যিকের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কেরও প্রতীক বলেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন কবি ডঃ শহীদুল্লাহ।
সব মিলিয়ে ষষ্ঠ ফোয়ারা মিলনমেলা হয়ে থাকল দুই বাংলার সাহিত্যিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভাষার বন্ধন, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কাঁটাতারের বিভাজন যেখানে ভূখণ্ডকে আলাদা করে, সেখানে কবিতা ও মানবতা যে হৃদয়কে এক করতে পারে, ফটিকরায়ের এই মিলনমেলা যেন সেই চিরন্তন সত্যই আরও একবার প্রতিষ্ঠা করল।