মনোজ কুমার ওঝা / ডুমডুমা
অসমের ঐতিহাসিক তেলনগরী ডিগবয়ের শিখ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলি এক শতাব্দীর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক বার্তা বহন করছে, যা ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে যায়। সেই বার্তা হল, ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মানুষকে একত্রিত করতে পারলেই ধর্মবিশ্বাস আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
অসমের তিনসুকিয়া জেলার এই ঐতিহাসিক তেলনগরীতে শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন কেবল শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর উপলক্ষ হয়ে ওঠেনি, বরং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ডিগবয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে আরও একবার তুলে ধরেছে। এই উদযাপন এমন একটি শহরের চিত্র তুলে ধরছে, যেখানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ না হয়ে সম্মিলিত শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
অসমের ডিগবয়ের শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন
আয়োজক কমিটির এক সদস্য বলেন, “ওয়াহেগুরু জি কা খালসা, ওয়াহেগুরু জি কি ফতেহ! ডিগবয়ের দুটি গুরুদ্বার, তেলখাদ গুরুদ্বার এবং রিফাইনারি চারিয়ালি গুরুদ্বার, ১০০ বছর পূর্ণ করেছে। আমরা নগর কীর্তনের আয়োজন করেছি। আগামী ২৯, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর এবং ১ নভেম্বর তেলখাদ গুরুদ্বারে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলবে। এর মধ্যে থাকবে লঙ্গর, গুরুবাণী পাঠ এবং অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম। এই ঐতিহাসিক উপলক্ষটি যাতে আমরা সকলে একসঙ্গে উদযাপন করতে পারি, সেই উদ্দেশ্যে সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষকে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।”
শিখ ধর্মীয় স্তোত্রের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ভক্তিমূলক শোভাযাত্রা নগর কীর্তনের মাধ্যমে শিখ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। তেলখাদ গুরুদ্বারে আগামী দিনগুলিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে থাকবে লঙ্গর, একটি সামূহিক ভোজ, যা সাম্য ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শকে তুলে ধরে। পাশাপাশি থাকবে গুরুবাণী পাঠ এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। এই উদযাপনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে তুলে ধরে আয়োজকরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ডিগবয়ের বিধায়ক সুরেন ফুকনও ঐতিহাসিক শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারে আয়োজিত উন্মুক্ত সভায় যোগ দেন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে ওয়াহেগুরুকে স্মরণ করেন। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি ডিগবয়ে শিখ সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক উপস্থিতি, সমাজের প্রতি তাদের অমূল্য অবদান এবং দেশসেবায় তাদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেন।
অসমের ডিগবয়ের শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন
সুরেন ফুকন বলেন, “এই ঐতিহাসিক গুরুদ্বারের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য আমি সম্ভাব্য সমস্ত ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি।” একই সঙ্গে তিনি সকলকে ভ্রাতৃত্বের চেতনায় একসঙ্গে এগিয়ে আসার এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করে ডিগবয়কে আরও উন্নত শহর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন এই তেলনগরীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিখ বাসিন্দাদের অবদানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বার এক শতাব্দীর উপাসনা, সমাজসেবা এবং আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। এই ঐতিহাসিক মাইলফলক ধর্মীয় উপাসনালয়গুলিকে জীবন্ত বিশ্বাস ও সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করার গুরুত্বও তুলে ধরে।
আয়োজক কমিটির ওই সদস্য আরও বলেন, “সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষ আমাদের সমর্থন করছেন। গত একশো বছর ধরে আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির পরিবেশে বসবাস করে আসছি। আগামী দিনগুলিতেও এই ঐতিহ্য বজায় থাকবে বলে আমরা আশা করি। আমাদের একে অপরকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে হবে।”
অসমের ডিগবয়ের শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন
এই বার্তা ডিগবয়ের বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় পরিমণ্ডলেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। দুর্গাপুজো হিন্দু ভক্তদের উৎসবের আনন্দে একত্রিত করে, অন্যদিকে মহর্ষি বাল্মীকি জয়ন্তীর মাধ্যমে রামায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত শ্রদ্ধেয় ঋষি বাল্মীকিকে স্মরণ করা হয়। ঈদ-সহ মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক সমাবেশও এই অঞ্চলের বৃহত্তর ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গুরুদ্বারগুলিতে শিখ ধর্মীয় ঐতিহ্য, খ্রিস্টানদের উপাসনা এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের আধ্যাত্মিক শিক্ষা, সব মিলিয়ে শহরটির ধর্মবিশ্বাসের বিস্তৃত বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এই ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলির আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষায় পার্থক্য থাকলেও সহমর্মিতা, সেবা, মর্যাদা এবং সহমানবের প্রতি শ্রদ্ধার মতো মূল্যবোধগুলি সকলের মধ্যে এক অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করে। ডিগবয়ের সামাজিক কাঠামোর তাৎপর্য ধর্মীয় পার্থক্যের অনুপস্থিতির মধ্যে নয়, বরং একে অপরের বিশ্বাস ও রীতিনীতিকে সম্মান জানিয়ে একসঙ্গে বসবাস করার সম্ভাবনার মধ্যে নিহিত।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে ঐতিহাসিক বিকাশ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের আগমনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে ডিগবয়। শহরটি বৈচিত্র্যময় অসমের বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। এখানকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ভিত্তিক উদযাপন মানুষকে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখার পাশাপাশি শহরের সম্মিলিত জীবনের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।
অসমের ডিগবয়ের শ্রী গুরু সিং সভা গুরুদ্বারের শতবর্ষ উদযাপন
তাই এই শতবর্ষ উদযাপন শিখ সম্প্রদায়ের কাছে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের চেয়েও বেশি কিছু। এটি শহরের সমস্ত বাসিন্দাকে উপলব্ধি করার আহ্বান জানায় যে, কোনও একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হলে তা গোটা শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই সমৃদ্ধ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ও শুভেচ্ছা এই উপলক্ষকে সম্মিলিত আত্মীয়তা ও একাত্মতার উদযাপনে পরিণত করতে পারে।
উদযাপন চলাকালীন ডিগবয় থেকে উঠে আসা বার্তাটি সহজ, অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী, ধর্মবিশ্বাসের কাজ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা, বিভেদের প্রাচীর তৈরি করা নয়। এক শতাব্দীর সহাবস্থান কেবল স্মরণ করার মতো একটি ইতিহাস নয়; এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও আমাদের দায়িত্ব।
প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নিয়ে এবং মানবতার বন্ধনে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ডিগবয় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অর্থবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে পারে।