শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন, ২০২৬ সালের সূচনালগ্নে এক অনন্য সম্প্রীতির ছবি ধরা পড়ল সমাজের বুকে। বছরের প্রথম সকালে মানুষের ঢল নামল সোনাপুরের সমাধিক্ষেত্রে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ সমবেত হলেন প্রিয় শিল্পী জুবিন গার্গের সমাধির সামনে। শোক, শ্রদ্ধা, আবেগ আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল জুবিনের সমাধিক্ষেত্র।
সকাল থেকেই মানুষের আনাগোনায় মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। কেউ হাতে ফুল নিয়ে, কেউ চোখের জলে ভেজা মুখে, কেউ আবার নীরব প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন। সমাধির সামনে শোনা যাচ্ছিল ভিন্ন ভিন্ন ভাষার গান—কোথাও হিন্দিতে, কোথাও অসমিয়ায়, কোথাও বা বাংলায়। সেই গানের সুরে ছিল না কোনও বিভাজন, ছিল কেবল এক মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। জুবিন যেন আজ আর শুধুমাত্র একজন শিল্পী নন, তিনি হয়ে উঠেছেন সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক।
অনেকে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রার্থনা করেছেন জুবিনের আত্মার শান্তির জন্য। কারও চোখে ছিল নিঃশব্দ কান্না, আবার কেউ উচ্চস্বরে বলছিলেন—এই ঘটনার বিচার হওয়া উচিত। মানুষের মুখে মুখে ঘুরছিল একটাই কথা—ন্যায়বিচারই পারে জুবিনের আত্মাকে প্রকৃত শান্তি দিতে। কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে বলছেন, “জুবিন সুবিচার পাক” ।
জুবিনের সমাধিক্ষেত্র
তবে এদিনের সবচেয়ে বড় ছবি ছিল সম্প্রীতির। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছেন। কোথাও হাঁটু মুড়ে খোলা আকাশের দিকে হাত তুলে প্রার্থনার দৃশ্য, কোথাও দুহাত জুড়ে মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করার দৃশ্য, কোথাও নীরব ধ্যান—সব মিলিয়ে এক সর্বধর্ম সমন্বয়ের অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সমাধিক্ষেত্র যেন মুহূর্তের মধ্যে এক মিলনভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানের একমাত্র পরিচয় ছিল ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
সমাধি ক্ষেত্রে দর্শন করতে আসা ভক্তদের অনেকেই বলেন, এমন দৃশ্য তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। নববর্ষের দিনে যেখানে মানুষ সাধারণত আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে, সেখানে আজ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। অনেকেই বলছেন, জুবিন তাঁর গানের মধ্য দিয়ে যেমন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়েছিলেন, তাঁর সমাধিক্ষেত্রও আজ সেই বার্তাই বহন করছে।
জুবিনের সমাধিক্ষেত্র
এই সমাধিক্ষেত্র আজ যেন একটি প্রতীকে রূপ নিয়েছে—যেখানে কোনও বিভেদ নেই, নেই কোনও সংকীর্ণতা। আছে শুধু ভালোবাসা, মানবতা আর একসঙ্গে থাকার অনুভূতি। নববর্ষের প্রথম দিনে এই দৃশ্য সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে একতার পথে হাঁটার কথা।
২০২৬ সালের প্রথম দিনে জুবিনের সমাধিক্ষেত্র শুধু স্মৃতির স্থান হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির সুরে বাঁধা এক অনন্য মিলনভূমি। সর্বধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে স্পষ্ট—জুবিন আজ শুধুই একজন শিল্পী নন, তিনি এক সম্প্রীতির সুর, এক মানবিক চেতনার মুখ।