তরুণ নন্দী / কলকাতা
বাংলার রাজনীতিতে যেন হঠাৎ উল্কার মতো উদয় হয়েছে নওশাদ সিদ্দিকি। যাকে ‘ভাইজান’ বলে ডাকেন অনুগামীরা। এই মুহুর্তে যাঁর নাম ভাঙড়ের অলিগলি থেকে শুরু করে বাংলার রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নওশাদের এই উত্থান ক্ষমতার জোরে নয়, তার এই জনপ্রিয়তা এক অদম্য জেদ আর প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার কারণেই।
ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা হিসেবে তাঁর পরিচয় যথেষ্ট ছিল। জীবনটা ধর্মীয় কেন্দ্রিক আবদ্ধ করে অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে জন্ম নেওয়া এই নওশাদ সিদ্দিকী বেছে নিলেন এক অন্য পথ। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নওশাদ জানেন, কলম আর কণ্ঠস্বরই হলো পরিবর্তনের আসল অস্ত্র।
নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে হেভিওয়েটদের ভিড়ে নতুন দল 'আইএসএফ' (ISF) লড়াই করছিল। নতুন মাঠে নেমেই একাই কেল্লা ফতে করেছিলেন। আইএসএফের একমাত্র বিধায়ক হয়ে পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। নানা মঞ্চ থেকে তার যুক্তিপূর্ন ভাষণ শুনে অনেকেই বলেছিলেন এছেলে অনেকদূর যাবে। তিনি বার্তা দিয়ে বোঝালেন, রাজনীতিতে পেশিশক্তির চেয়ে জনসমর্থন আর মনের সাহস অনেক বেশি কার্যকরী।
এত জনপ্রিয়তার মাঝেও নওশাদের জীবনে এসেছে প্রতিকূলতা। রাজনীতির ময়দানে পা রাখতে না রাখতেই ধর্মতলায় আইএসএফ পুলিশের সংঘর্ষে নওশাদ ও তাঁর দলের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সেই সময় টানা ৪০ দিন অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি থেকেও তাঁর মেরুদণ্ড বাঁকাতে পারেনি শাসকদল।
উল্টে দেখা গেল, জামিনে মুক্তি পেয়ে ভাঙড়ের মাটিতে পা রাখতেই দ্বিগুণ উৎসাহে প্রিয় নেতাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন অনুগামী থেকে সাধারণ মানুষ। সেসময় তাঁর চোখের চাউনি বলে দিয়েছিল, তাঁর লড়াই হল শুরু। যে ভাঙড় একসময় আরাবুল-সওকতদের ‘গড়’ বলে পরিচিত ছিল, সেখানে নওশাদের মধ্যে আমজনতা যেন খুঁজে পায় নিজেদের ‘ভাইজান’কে।
সাদামাটা এই মানুষটিকে নিয়েও রয়েছে অনেকের কৌতুহল। বর্তমানে নওশাদের সম্পত্তির খতিয়ান নিয়ে অনেক চর্চা রয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, রাজনীতির ময়দানে বিধায়ক হতেই পারলে অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় নেতাদের সম্পত্তির পাহাড় গড়ে ওঠে। সেই পেক্ষাপট থেকে দেখলে নওশাদ তাঁর হলফনামায় জানিয়েছেন তাঁর নিজের নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। ২ লক্ষ থেকে ৩৩ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তির বৃদ্ধি মূলত একটি ব্যবহৃত গাড়ি আর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের হিসাব মাত্র।
নওশাদ সিদ্দিকি
আইএসএফের এই তরুণ তুর্কীর এই সাদামাটা জীবন আর স্বচ্ছতা নিয়ে সমাজের কাছে এক বড় বাক্তা পৌঁছেছে। তিনি প্রমাণ করছেন, রাজনীতি মানেই নিজের আর পরিবারের আখের গোছানো নয়। বরং রাজনীতি মানে মানুষের সেবা নিজেকে ব্যস্ত রাখা।
নওশাদ সিদ্দিকি একমাত্র বিধায়ক হলেও গোটা দলের আইকন তিনি। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলো উচ্চশিক্ষিত হয়েও মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন সহজেই। এই স্বভাবের জন্য অল্প কয়েকদিনেই নওশাদকে করে তুলেছে প্রকৃত জননেতা। প্রতিকূল সময়েও নীতিতে অটল থাকার মত ধৈর্য বোধহয় দেখাতে পারেন এই মানুষটাই।
ভাঙড় থেকে ক্যানিং, নওশাদের দাপট আসলে সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। বাংলার রাজনীতিতে দুর্নীতি যখন ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় তখন নওশাদ সিদ্দিকীর মত এই 'তরুণ আইকন' আজও হাজারো যুবকের চোখে স্বপ্ন বুনে দিচ্ছেন। এক অজানা পীরজাদা থেকে বাংলার রাজনীতির অপরিহার্য ‘ভাইজান’ হয়ে ওঠার এই সফর বাংলার ইতিহাসে বিরল।