সাংবাদিক সুকুমার বাগচী চলে গেলেন অনন্তলোকে

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
সাংবাদিক সুকুমার বাগচী চলে গেলেন অনন্তলোকে
সাংবাদিক সুকুমার বাগচী চলে গেলেন অনন্তলোকে
 
উদয়ন বিশ্বাস / গুয়াহাটি

উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিশিষ্ট সাংবাদিক সুকুমার বাগচী গতকাল রাত এগারোটায় অনন্তলোকে চলে গেলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর-বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মুম্বাইতে বড় মেয়ের কাছে ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে শ্বাস-কষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। অবশেষে মৃত্যু তাঁকে ছিনিয়ে নিল। রেখে গেছেন দুই কন্যা, দুই জামাই ও নাতি-নাতনি।
 
কবিতা লেখার সূত্রেই বিজ্ঞাপন সংস্থার কাজ দিয়ে জীবন শুরু। এরপর স্টেট ব্যাংক। পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেছেন। আশির দশকে চাকরি সূত্রে ছিলেন শিলঙে। কাজ করতেন ডাক ও তার বিভাগে। কর্মরত অবস্থায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ফলে তাঁকে জেলে যেতে হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে শুরু হয় সাংবাদিকতার জীবন। প্রথম দিকে আংশিকভাবে তিনি সংবাদসংস্থা ইউএনআই-র হয়ে সংবাদ পরিবেশন করতেন। ১৯৮৩ সালে গুয়াহাটি থেকে যখন 'দ্য সেন্টিনেল' ইংরেজি দৈনিক বেরোয় তখন থেকেই তিনি পুরোপুরি চলে এলেন সাংবাদিকতার জগতে। উত্তর-পূর্বের বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে তিনি 'দ্য সেন্টিনেলে'র সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে সেন্টিনেল গ্রুপ যখন বাংলা দৈনিক 'সময় প্রবাহ' প্রকাশ করে তখনই তিনি সম্পাদক হয়ে চলে এলেন গুয়াহাটিতে। প্রায় তেরো বছর তিনি এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। এই সময় তাঁর বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন চারদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে অসমের বেশ কিছু চা-বাগানের মালিকদের বেদখল (সরকারি জমি) নিয়ে তাঁর প্রতিবেদন রাজ্য সরকারের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ২০০৯ সালে তিনি শিলং টাইমস গ্রুপের বাংলা দৈনিক 'সংবাদ লহরি'র প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
 
সেন্টিনেল গ্রুপে থাকাকালীন দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে তাঁকে অসম্ভবকে সম্ভব করতে দেখেছি। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় সমান দক্ষতা থাকায় যেকোনো অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দুটো ভাষায় নিজেই কম্পোজ করে ডেস্কে প্রিন্ট-আউট পৌঁছে দিয়েছেন। অন্যদিকে কখনো কখনো কোনো সহ-সম্পাদক বা অপারেটরকে দুটো ভাষায় ডিকটেশন দিয়ে কপি তৈরি করিয়েছেন। এসব যেন তাঁর সহজাত দক্ষতা। আর সেই প্রতিবেদন এমন নিখুঁতভাবে তৈরি করতেন যেখানে সংশ্লিষ্ট সম্পাদকের যোগবিয়োগের কোনো সুযোগ হতো না। এমন বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি।
 
অন্যদিকে সোফোক্লিসের বিখ্যাত গ্রিক ট্র্যাজেডি 'অয়দিপাউস তিরান্নোস' নাটকটির শম্ভু মিত্র অনুদিত 'রাজা অয়দিপাউস' গুয়াহাটি, কলকাতা, বাংলাদেশ-সহ অনলাইনে এককভাবে পাঠ করে তিনি অভিনন্দিত হয়েছেন। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা বানান ও উচ্চারণ শুদ্ধির বিষয়ে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই দুটি বিষয়ে তাঁর প্রয়াস ও ভাব-ভাবনা ভাষা-চিন্তকদের কাছে আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে। এ-কথাও স্বীকার্য যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলা বানান সম্পর্কে সজাগতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কে তাঁর দুটি বই বাংলাভাষীদের কাছে অনন্য সম্পদ। সরস ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা এবং যৌক্তিক নিষ্ঠা, ভাষার দৃঢ়তা ও ব্যঞ্জনা বিষয়গুলিতে সুবিন্যস্ত। যুক্তি-বুদ্ধির ঔদ্ধত্যে নয়, বরং যুক্তিশীল গবেষণাধর্মিতার আলোকে রচনাগুলি উজ্জ্বল হয়ে আছে। লক্ষণীয় যে বই দুটির একটি তিনি উৎসর্গ করেছেন প্রখ্যাত অভিনেতা, নাট্যকার, আবৃত্তিশিল্পী ও কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে, অন্যটি বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও বহু অভিধান-প্রণেতা বন্ধুবর সুভাষ ভট্টাচার্যকে। সম্পাদক হিসেবে তাঁর স্পর্ধা ছিল সুবিদিত। একটি দৈনিকের সম্পাদকের দায়িত্বে থেকে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে ছন্দবদ্ধ কবিতায় প্রতি বছর তিনি সম্পাদকীয় লিখে গেছেন। এমন ঘটনা দেশের অন্য কোনো দৈনিকে ঘটেছে কি না আমার জানা নেই। প্রথিতযশা সম্পাদক সাগরময় ঘোষ বলেছেন, '...রবীন্দ্র জন্মদিনের উপর কবিতাগুচ্ছ পড়ে অভিভূত। প্রতি বছর লিখে যাও, পরে বই করে ছেপে দিও।'
 
কবি, গদ্যকার, মঞ্চাভিনেতা ও বাচিক শিল্পী হিসাবে তাঁর পরিচিতি সর্বমান্য। সুগন্ধীর জীবনবোধ, অফুরান প্রাণশক্তি, অনাড়ম্বর জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক মনন ও দায়বদ্ধতা ছিল তাঁর স্বকীয় বৈশিষ্টা। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- কবিতা সংকলন: সমর্পণ, গোধূলির দিনলিপি, জন্মদিন প্রতিদিন (পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে 'সময় প্রবাহ'-তে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র সংকলন), দূরের জানালা ও এইসব এলোমেলো। সম্পাদিত গ্রন্থ: সবুজ পাতার ডাক (ইতিহাসবিদ হারীতকৃষ্ণ দেব), রামের সুমতি ও শ্রীকান্ত। প্রবন্ধ সংকলন: বর্ণমালা ও কিংবদন্তির মণিপুর, বাংলা উচ্চারণের নিয়মাবলি ও বাংলা বানান ও উচ্চারণ।
 
'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকার সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। তাঁর বেশ কয়েকটি মূল্যবান প্রবন্ধ এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সোফোক্লিসের বিখ্যাত গ্রিক ট্র্যাজেডি 'অয়দিপাউস তিরান্নোস' নাটকটি তিনি পত্রিকা আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাঠ করেছেন। গত বছর এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র পত্রিকা 'মজলিশ সংলাপ' তাঁকে নিয়ে একটা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। অসম সরকারের সাহিত্যিক পেনশন পেয়েছেন তিনি।
 
তাঁর মৃত্যুতে 'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকাগোষ্ঠী শোকাহত। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা।