আরাবুল তৃণমূলের ‘সম্পদ’ থেকে কীভাবে হলেন প্রতিপক্ষ? ‘ঘরের ছেলে’ এখন হয়ে উঠেছেন ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
বাংলার রাজনীতিতে ভাঙড় এবং আরাবুল ইসলাম, এই দুটি নাম যেন সমান্তরালভাবেই চলে। কলকাতা সংলগ্ন দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতির মানচিত্রে ভাঙড় মানেই উত্তেজনার আবহ। আর এই ভাঙড়ের দীর্ঘসময়ের নিয়ন্ত্রক ছিলেন আরাবুল ইসলাম। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে আরাবুলের উত্থানের নেপথ্যে ছিল মমতার হাত। তৃণমূলের সেই বিশ্বস্ত সৈনিক আরাবুল ইসলাম আজ শাসক শিবিরের প্রধান প্রতিপক্ষ। তৃণমূলে থাকাকালীন দীর্ঘদিন কোনঠাসা থাকার পর দলবদল করে আইএসএফ-এ (ISF) যোগ দিয়ে আরাবুল বুঝিয়ে দিয়েছেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলে নিজের দাপট।
সত্যি কথা বলতে কি, আরাবুল ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা হতে পারে। ভাঙড় কলেজ থেকে শুরু করে পঞ্চায়েতের অলিন্দ, সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। তৃণমূলের(TMC) শুরুর দিনগুলোতে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সংগঠন বিস্তার করা খুব সহজ কাজ ছিল না। রীতিমত কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে বুক চিতিয়ে লড়াই করে নিজের জমি শক্ত করেছেন আরাবুল। তাঁর অনুগামীদের কথায়, ভাঙড়ে এমন কোনো গলি বা রাজপথ নেই যেখানে আরাবুলের হাতের ছাপ নেই। তবে এই রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক। শিক্ষিকাকে নিগ্রহের অভিযোগ হোক বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দলকে অস্বস্তিতে ফেলার কারণে একাধিকবার তাঁকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার বা সাসপেন্ড হতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই নিজে বুঝিয়েছেন রাজনৈতিক পেক্ষাপটে তিনি কতটা অপরিহার্য। আর এভাবেই সগৌরবে বারবার দলে ফিরেছেন তিনি।
.webp)
তৃণমূলের অন্দরে ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লার সঙ্গে আরাবুলের ক্ষমতার লড়াই বাংলার রাজনৈতিকমহলে কারোরই অজানা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দিনে ভাঙড়ের রাশ ক্রমশ শওকতের হাতে চলে যাওয়ায় দলের মধ্যে থেকেও কোণঠাসা হয়ে পড়ছিলেন দাপুটে নেতা আরাবুল। নিজের তৈরি করা দুর্গে নিজেই অস্তিত্ব সংকটে থাকার যন্ত্রণা থেকেই নিয়ে নেন কঠিন সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ কয়েক দশকের সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে দলবদল করে ফেলেন। তিনি বেছে নিয়েছেন নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ-কে।
আরাবুলকে দলে নিয়ে নওশাদ সিদ্দিকী এক মোক্ষম চাল চেলে দেন। এতদিনের তৃণমূলের ‘সম্পদ’ আরাবুলকে করে দেন সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। আইএসএফ নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূল তাঁকে শুধুমাত্র ব্যবহার করেছে কিন্তু তাঁরা সেই আরাবুলকে মূলস্রোতে ফেরাতে চান এক দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে। আরাবুল আইএসএফ প্রার্থী হওয়ায় ভাঙড় ও ক্যানিংয়ের বড় একটা অংশে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড়সড় ধস নামাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূলের দাবি, তাদের একসময়ের ‘ঘরের ছেলে’ এখন হয়ে উঠেছেন ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। ভাঙড়ের ভোট-রাজনীতিতে আরাবুলের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা কাজে লাগাতে পারলে হয়ত তৃণমূলের জয় ছিনিয়ে আনা কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। এখন দেখার বিষয় হল, আরাবুলের এই জার্সি বদল ভাঙড়ের মানুষ গ্রহণ করেন।