Story by Aparna Das | Posted by Aparna Das • 1 h ago
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপর্ণা দাস/ গুয়াহাটি
কোনো একটি নাম কি কখনও একটি সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার সমার্থক হতে পারে? কোনো একজন মানুষ কি একাই ধারণ করতে পারেন সাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শন, শিক্ষা, সমাজচিন্তা এবং মানবতার এত বিস্তৃত পরিসর? আমার কাছে এর উত্তর একটাই- গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজকের দিনে কেউ যদি একসঙ্গে ইউটিউব ক্রিয়েটর (YouTube creator), লেখক, সুরকার (musician), শিক্ষাবিদ (educator) আর ইনফ্লুয়েন্সর (influencer) হন, আমরা তাঁকে ‘multi-talented’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেই ধারণারও বহু ঊর্ধ্বে-তিনি একাই ছিলেন কবি, সুরকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকের এক বিস্ময়কর সমন্বয়। আজকের ভাষায় বললে, তিনি যেন একাই একটি ‘all-in-one creative ecosystem’। তাঁকে পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি অধ্যায়ে বেঁধে ফেলা যায় না, পরীক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি এমন এক বিস্তার, যা বইয়ের পাতার বাইরে গিয়ে জীবনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। তাই আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথ কোনো সিলেবাসের অংশ নন-তিনি নিজেই এক চলমান, জীবন্ত সিলেবাস; এক অনন্ত বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শেখার কোনো শেষ নেই।
আজকের দিনে, বিশেষ করে রবীন্দ্র জয়ন্তীর প্রেক্ষাপটে, এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমরা যখন তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন করি, তখন কি আমরা সত্যিই তাঁর চিন্তাধারার গভীরে পৌঁছাতে পারি? নাকি গান, আবৃত্তি আর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই তাঁকে আটকে রাখি? এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমাদের শৈশবের প্রথম কবিতা, প্রথম গল্প, সবকিছুর শুরুই যেন রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ছড়া, তাঁর সহজ ভাষার কবিতা আমাদের মনকে ছুঁয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে স্কুল, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার প্রতিটি স্তরে তিনি থেকে যান আমাদের সঙ্গী হয়ে। কোথাও তিনি পাঠ্য, কোথাও তিনি ভাবনা, কোথাও তিনি দর্শন। কিন্তু কখনওই তিনি শেষ হয়ে যান না। বরং যতই আমরা এগোই, ততই তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করি। আজও তাঁর উপর অসংখ্য গবেষণা চলছে, নতুন নতুন ব্যাখ্যা উঠে আসছে, তবুও রবীন্দ্রনাথ যেন এক অনন্ত প্রবাহ, যার কোনো শেষ নেই, কোনো সীমা নেই।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবন এতটাই বিস্তৃত যে তাকে কোনো নির্দিষ্ট ধারায় বেঁধে রাখা যায় না। ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে ‘ঘরে-বাইরে’, ‘গোরা’ থেকে ‘শেষের কবিতা’, প্রতিটি রচনায় তিনি নতুন করে মানুষ, সমাজ এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন, বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, আর সেই অভিজ্ঞতার গভীর ছাপ পড়েছে তাঁর সাহিত্য ও দর্শনে। তাই তাঁর সৃষ্টিতে যেমন বাঙালিয়ানা আছে, তেমনি আছে বিশ্বমানবতার এক বিস্তৃত প্রতিফলন। তাঁর কবিতায় যেমন আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবোধের মেলবন্ধন, তেমনি তাঁর উপন্যাসে জাতীয়তাবাদ, নারীস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জটিল বিশ্লেষণ। তিনি শুধু সাহিত্য রচনা করেননি, তিনি চিন্তার নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন।
১৮৮১ সালে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ নাটকে শিরোনাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যেখানে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরা দেবী দেবী লক্ষ্মীর চরিত্রে
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অন্যতম শিখর আসে যখন তিনি ‘গীতাঞ্জলি’-র ইংরেজি অনুবাদ 'Song Offerings'-এর জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু ভারত নয়, সমগ্র এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। পশ্চিমা সাহিত্যজগৎ তাঁর কবিতার গভীরতা ও দার্শনিকতায় মুগ্ধ হয়, এবং এই স্বীকৃতি ভারতীয় সাহিত্যকে বিশ্বমানচিত্রে এক নতুন মর্যাদা এনে দেয়।
আজকের Spotify playlist যেভাবে আমাদের অনুভূতিকে সাজিয়ে দেয়, রবীন্দ্রসংগীত বহু আগেই সেই কাজটি করে এসেছে। আর এই কথাটা বুঝলেই তাঁর সৃষ্টির বিশালতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি প্রায় ২২০০-রও বেশি গান রচনা করেছেন, যা ‘গীতবিতান’-এ সংকলিত। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যভাণ্ডারে রয়েছে প্রায় ১২টি উপন্যাস, প্রায় ৯৫টিরও বেশি ছোটগল্প, প্রায় ৫০টির কাছাকাছি নাটক ও নৃত্যনাট্য, প্রায় ১৩টি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ এবং সহস্রাধিক কবিতা, যা বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে সংকলিত। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র, সব মিলিয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। বাংলা ছোটগল্পের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি এক নতুন ধারার সূচনা করেন, আবার নাট্যসাহিত্যেও তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল অনন্য। শিশু সাহিত্য থেকে গভীর দর্শনচিন্তা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতায় লিখেছেন। এই বিপুল সৃষ্টির পরিসরই প্রমাণ করে, তিনি কোনো একটি বিভাগের নন, বরং এক সম্পূর্ণ জ্ঞানের ভাণ্ডার।
শান্তিনিকেতনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মহাত্মা ও কস্তুরবা গান্ধী, ১৯৪০
আজ কেউ বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে কনটেন্ট (content) তৈরি করলে আমরা তাকে গ্লোবাল ইনফ্লুএন্সর (global influencer) বলি। কিন্তু অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ সেই কাজটি ভিন্ন মাত্রায় করে গিয়েছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে তিনি সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে নিজের লেখায় ধারণ করেছেন, তাই আজকের ভাষায় তিনি ছিলেন এক গ্লোবাল থিঙ্কার (global thinker), যাঁর লেখা যেন এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল ট্রাভেল ব্লগ (intellectual travel vlog)। এই ভ্রমণেরই প্রতিফলন দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখা তাঁর চিঠিপত্রে, যা আজ ‘ছিন্নপত্র’ বা ‘ছিন্নপত্রাবলী’-র মতো গ্রন্থে সংকলিত হয়ে সাহিত্য হিসেবে সমান মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর কাছে লেখা শুধু মাধ্যম নয়, এক অবিরাম সৃষ্টির ধারা।
শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিপ্লবাত্মক। শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শের এক বাস্তব ও দূরদর্শী রূপায়ণ। প্রকৃতির কোলে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার ধারণাকে সামনে রেখে তিনি এখানে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র, যা পরে 'বিশ্ব ভারতী' হিসেবে বিকশিত হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল, “যেখানে বিশ্ব এক নীড়ে এসে মিলবে”, এই ভাবনা থেকেই তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ নানা দেশ থেকে বিশিষ্ট শিক্ষক ও পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান, যাতে ছাত্ররা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। সাহিত্য, ভাষা, সঙ্গীত, শিল্প, দর্শন, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই বিশ্বজনীন আদান-প্রদান শিক্ষাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, সেই সময়ে যখন নারীদের শিক্ষা বহু ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখন শান্তিনিকেতনে মেয়েদের জন্যও তিনি বহুমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ, গান, শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল শিক্ষায় নারীদের সমানভাবে দক্ষ করে তোলার যে আধুনিক ও মুক্ত চিন্তার উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা সেই যুগে সত্যিই অভিনব ছিল। বর্তমান সময়ে শান্তিনিকেতন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যকর থাকলেও, তার মূল দর্শন এখনও বহুমাত্রিক শিক্ষার অনুপ্রেরণা জোগায়। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (UNESCO World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা তাঁর চিন্তার বৈশ্বিক গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকে নতুন করে তুলে ধরে।
১৯৪১ সালে লেখকের দেহাবসানের পূর্বে প্রাপ্ত তাঁর শেষ ছবি
ভারতের ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে’ এবং বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’, এই দুই দেশের জাতীয় সংগীতই তাঁর লেখা, যা বিশ্বসাহিত্যে এক বিরল ঘটনা। আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল, শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের সঙ্গেও তাঁর এক পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। শান্তিনিকেতনে তাঁর শিষ্য আনন্দ সিমারানকুল, যিনি শ্রীলঙ্কার নাগরিক, রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের একটি গানের অনুকরণে ‘মাতা শ্রীলঙ্কা, নম নম নম নম মাতা, সুন্দর শ্রী বরনী’ রচনা করেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, তাঁর সৃষ্টির প্রভাব দেশ-কাল-ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাঁর গ্রামোন্নয়নের কাজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ও স্বনির্ভরতার উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু ব্যক্তিগত উন্নতি নয়, সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাঁর সমাজসংস্কারক ভাবনা তাঁর সাহিত্যেই স্পষ্ট। ‘বিসর্জন’-এ তিনি অন্ধ ধর্মীয় আচার ও বলিপ্রথার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, আর ‘কাবুলিওয়ালা’-য় এক আফগান মুসলমান চরিত্রের মাধ্যমে ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবিক সম্পর্কের কথা বলেন। ‘গোরা’-তে জাতপাত ও পরিচয়ের সংকট, ‘চণ্ডালিকা’-য় অস্পৃশ্যতা প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ এবং ‘ইহুদি’ প্রসঙ্গেও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ফুটে ওঠে। এসব রচনায় তিনি দেখিয়েছেন, সমাজের সত্যিকারের পরিবর্তন আসে মানুষের চিন্তা ও মানবিকতার জাগরণে।
কখনও কখনও মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ শুধু তাঁর সময়কে দেখেননি, তিনি যেন ভবিষ্যতের মানুষকেও পড়ে ফেলেছিলেন। ১৮৬১ সালে জন্ম নেওয়া একজন লেখকের ভাবনা আজ ২০২৬ সালেও এতটাই প্রাসঙ্গিক, তা ভাবলেই বিস্ময় জাগে। মানুষের মন, তার টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা, এই সবকিছুর যে সূক্ষ্ম আঁতের কথা তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন, তা আজও বিরল। ‘চোখের বালি’-র মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, বিনোদিনীর অন্তর্দ্বন্দ্ব, ‘ঘরে-বাইরে’-র বিমলার দোলাচল বা ‘শেষের কবিতা’-র অমিতের আত্মবিশ্লেষণ-সবই যেন আজকের মানুষের ভেতরের কথাকে তুলে ধরে। তাঁর লেখার আধুনিকতা এমনই যে, আজকের প্রজন্মের ভাবনাকেও অনেক সময় ছাপিয়ে যায়। তাই মনে হয়, আজ থেকে আরও ১০০ বছর পরেও তাঁর রচনা তখনকার মানুষের মনেও একইভাবে সাড়া দেবে-কারণ রবীন্দ্রনাথ কোনো একটি সময়ের নন, তিনি সময়কে অতিক্রম করে থাকা এক অনন্য সত্তা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ-আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে পড়ছি, নাকি শুধু তাঁকে পড়ার ভান করছি? কারণ তাঁকে সত্যিকারের বুঝতে গেলে বইয়ের পাতা নয়, দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তিনি আমাদের শেখান কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, জ্ঞানকে অনুভব করতে; কেবল জীবনকে দেখা নয়, তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে। তাই রবীন্দ্রনাথ কোনো অতীত নন, কোনো স্মৃতিও নন, তিনি এমন এক চেতনা, যা সময়ের সঙ্গে বদলায় না, বরং সময়কেই নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর মধ্যে আমরা শুধু একজন সাহিত্যিককে পাই না, পাই এক অন্তহীন যাত্রার দিশা। সেই অন্তহীন যাত্রার দিশারি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর জন্মজয়ন্তীর এই প্রভাতে জানাই আমার গভীরতম শ্রদ্ধাঞ্জলি।