‘সাজানো ঘটনা’ তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাসন, ১৪ বছর পর ফের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে দময়ন্তী সেন

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 39 m ago
‘সাজানো ঘটনা’ তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাসন, ১৪ বছর পর ফের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে দময়ন্তী সেন
‘সাজানো ঘটনা’ তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাসন, ১৪ বছর পর ফের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে দময়ন্তী সেন
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

কলকাতার প্রশাসনিক অন্দরমহলে তিনি একসময় ছিলেন দৃঢ়তা, দক্ষতা ও নির্ভীকতার প্রতীক। নারী হয়েও নয়, বরং একজন কঠোর ও পেশাদার পুলিশ অফিসার হিসেবেই নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল চরমভাবে। ক্ষমতার অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনে একসময় কার্যত প্রশাসনের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। দীর্ঘ ১৪ বছর পরে সেই দময়ন্তী সেনই আবার ফিরছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। যেন এক তেজস্বিনী নারীর হার না মানা প্রত্যাবর্তনের গল্প।
 
১৯৯৬ ব্যাচের আইপিএস অফিসার দময়ন্তী সেন ছিলেন কলকাতা পুলিশের প্রথম মহিলা জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম)। পরে তিনি স্পেশাল কমিশনার পদেও দায়িত্ব সামলেছেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং জটিল অপরাধ তদন্তে তাঁর সাফল্য তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে ২০১২ সালের পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলা।
 
২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে পার্ক স্ট্রিটের একটি নাইটক্লাব থেকে ফেরার পথে সুজেট জর্ডান নামে এক মহিলাকে চলন্ত গাড়ির মধ্যে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। গোটা রাজ্য তখন উত্তাল। সদ্য ক্ষমতায় আসা তৃণমূল সরকারের ওপর বিরোধীদের চাপ বাড়ছিল। সেই সময় কলকাতা পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের দায়িত্বে ছিলেন দময়ন্তী সেন। তদন্তের ভার পড়ে তাঁর কাঁধে।
দময়ন্তী সেনের নেতৃত্বে তদন্তকারী দল দ্রুত অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে। কয়েক দিনের মধ্যেই একে একে ধরা পড়ে অভিযুক্তরা। তদন্তের প্রতিটি ধাপে তিনি দেখিয়েছিলেন পেশাদারিত্ব এবং নিরপেক্ষতা। কিন্তু সেই সময় রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে এই ঘটনাকে “সাজানো ঘটনা” বলে মন্তব্য করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এই ঘটনা সামনে আনা হয়েছে।
 
ঠিক সেই সময়েই দময়ন্তী সেনের তদন্ত কার্যত সেই সরকারি অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ তাঁর তদন্ত স্পষ্ট করে দেয়, নির্যাতনের ঘটনা সত্যি এবং অভিযোগকারিণীর বক্তব্য ভিত্তিহীন নয়। প্রশাসনের একাংশের মতে, এই অবস্থানই তাঁর জীবনে বড় মোড় এনে দেয়। ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে লালবাজার থেকে সরিয়ে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁকে আর কোনও বড় বা আলোচিত তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
 
অনেকের মতে, এ যেন ছিল এক নীরব শাস্তি। একজন দক্ষ অফিসার, যিনি রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত না করে তদন্তকে সত্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে কার্যত প্রশাসনিক অন্ধকারে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দময়ন্তী সেন প্রকাশ্যে কখনও কোনও বিতর্কে জড়াননি। নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন।সময়ের চাকা ঘুরেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পরে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবার তাঁকেই ফের সামনে নিয়ে এলেন। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে সদস্য সচিব করা হয়েছে দময়ন্তী সেনকে। আগামী ১ জুন থেকে এই কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে। থানায় থানায় গিয়ে অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য সংগ্রহ এবং নির্যাতিতাদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ করবে এই কমিটি।এই দায়িত্ব শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদ নয়, বরং অনেকের চোখে এটি এক প্রতীকী প্রত্যাবর্তন।
 
যে অফিসারকে একসময় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ তিনিই আবার নারী নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারের অন্যতম মুখ হতে চলেছেন।দময়ন্তী সেনের এই প্রত্যাবর্তন যেন প্রমাণ করে, সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা রাখা গেলেও মুছে ফেলা যায় না। প্রশাসনের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে মতের অমিল কোনও সৎ অফিসারকে কোণঠাসা করেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই সময়ের সঙ্গে আবার ফিরে আসার সুযোগ পান। দময়ন্তী সেন সেই বিরল ব্যতিক্রম।
 
একসময় যাঁকে ‘সাইডলাইন’ করা হয়েছিল, আজ তিনিই আবার প্রশাসনের আস্থার কেন্দ্রে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের মধ্যে অনেকেই দেখছেন এক সাহসী নারীর নীরব লড়াইয়ের জয়। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সততাই তাঁকে ফিরিয়ে আনল নতুন দায়িত্ব, নতুন মর্যাদা এবং নতুন ইতিহাসের সামনে।