সেনা বাহিনীর সুদক্ষ চিকিৎসক তথা অসমের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার: মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতা

Story by  Nikunja Nath | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
 মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতা
মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতা
 
নিকুঞ্জ নাথ / গুয়াহাটি 

যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা দুর্যোগপীড়িত এলাকা, আকাশপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে আহত মানুষের জীবন বাঁচানো যেমন সাহসের পরিচয়, তেমনি তা এক বিশাল মানবিক দায়িত্বও। সেই কঠিন পথকেই নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন অসমের কন্যা মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিকিৎসা বিভাগের একজন দক্ষ কর্মকর্তা হওয়ার পাশাপাশি তিনি অসমের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। শোণিতপুর জেলার ছোট শহর ঢেকিয়াজুলি থেকে শুরু করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মানজনক ‘মেরুন বেরেট’ অর্জন পর্যন্ত তাঁর এই দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা আজ অসংখ্য মানুষের কাছে সাহস, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
 
অসমের শোণিতপুর জেলার ঢেকিয়াজুলিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মেজর ডাঃ কলিতা এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। অসমের একটি ছোট শহর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছনোর এই যাত্রা উৎকর্ষের প্রতি তাঁর অটল নিষ্ঠারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
 

তিনি প্রাথমিক ও স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন ঢেকিয়াজুলির দেবেন্দ্র গ্রিন গ্রোভ ইংলিশ স্কুলে। পরবর্তীতে তেজপুরের সম্মানীয় দরং কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান এবং এই ক্ষেত্রে নিজের জেলা থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া প্রথম ছাত্রী হিসেবে পরিচিত হন। তিনি ফিলিপাইনের ম্যানিলা থেকে সফলভাবে MBBS ডিগ্রি অর্জন করে নিজের পেশাগত যাত্রার এক সুন্দর সূচনা করেন।
 
বিদেশ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা গ্রহণ করে ভারতে ফিরে আসার পর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতা ২০১৫ সালে নয়াদিল্লির মর্যাদাপূর্ণ ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস’ (AIIMS) থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইন্টার্নশিপ সম্পূর্ণ করেন। এরপর তিনি দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় হাসপাতাল-সহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালে অসামরিক চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁর ট্রমা কেয়ার ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতাকে আরও নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
 
২০১৯ সালে তিনি আর্মি মেডিক্যাল কর্পস (AMC)-এর কর্মকর্তা ডাঃ সারাং মাটের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিবাহ কখনও তাঁর স্বপ্নের উড়ানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং ২০২০ সালে তিনি সারা দেশের ১০০ জনেরও বেশি প্রতিভাবান প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আর্মি মেডিক্যাল কর্পসে ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ত্রিশের দশকে পা দেওয়া এক বিবাহিতা মহিলা হিসেবে সক্রিয় সামরিক পরিষেবায় যোগ দিয়ে মেজর কলিতা বয়স, লিঙ্গ ও বৈবাহিক অবস্থাকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত দীর্ঘদিনের পুরনো ধারণাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানান।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Femina (@feminaindia)

 
তাঁর এই অদম্য স্পৃহা ও দৃঢ়তা ২০২৩ সালে এক ঐতিহাসিক মাইলফলকে পৌঁছায়। ৩৪ বছর বয়সে তিনি আগ্রায় অনুষ্ঠিত কঠোর প্যারাট্রুপার ও এয়ারবর্ন প্রশিক্ষণের জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন। অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং শরীর-মনকে চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা নেওয়া এই প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পূর্ণ করে তিনি বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘প্যারাট্রুপার ব্যাজ’ এবং সম্মানজনক ‘মেরুন বেরেট’ অর্জন করেন। এই মেরুন বেরেট অসাধারণ ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও অসীম সাহসের প্রতীক। এই বিরল সাফল্যের মাধ্যমে তিনি প্যারাট্রুপার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনকারী অসমের প্রথম মহিলা হিসেবে নিজের নাম সোনালি অক্ষরে লিখে রাখেন।
 
সম্প্রতি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে ‘মেজর’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ও দুর্যোগপীড়িত এলাকায় কাজ করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিট ‘প্যারাশুট মেডিক্যাল রেজিমেন্ট’-এ কর্মরত রয়েছেন। এই রেজিমেন্টের সদস্যদের সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে জীবনদায়ী চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে আকাশপথে প্যারাশুটের সাহায্যে নামানো হয়। মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দুর্গম ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকায় ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা, গুরুতর আহতদের চিকিৎসা করা এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা। তাঁর কর্মজীবন সামরিক চিকিৎসা পেশাদারদের সামনে থাকা অসাধারণ চ্যালেঞ্জগুলিকেই প্রতিফলিত করে।
 
মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে সাহসের কোনও বয়সসীমা নেই এবং লিঙ্গ বা বৈবাহিক অবস্থা কখনও একজন মানুষের সক্ষমতাকে নির্ধারণ করতে পারে না। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ফেমিনা ইন্ডিয়া পত্রিকার স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদে স্থান পেয়ে তিনি জাতীয় স্তরে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করেন। ওই সংখ্যায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর দশজন পথপ্রদর্শক মহিলা কর্মকর্তাকে সম্মান জানানো হয়েছিল, যেখানে কর্নেল সোফিয়া কুরেশি-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও গর্বের সঙ্গে স্থান পান।
 

তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের প্রশংসা করেছেন অসমের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীও। তিনি মেজর কলিতাকে শুধু রাজ্যের নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের মহিলাদের জন্য এক অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, অসম বিধানসভার প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ ডাঃ নোমল মোমিন সামাজিক মাধ্যমে মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতাকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, “ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মানীয় ‘মেরুন বেরেট’ অর্জন করে অসমের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার হিসেবে পরিচিত হওয়া মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। অসম থেকে উঠে এসে প্যারাশুট রেজিমেন্টের মতো উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর তাঁর এই অসাধারণ যাত্রা সাহস, শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেনাবাহিনীর একজন নিষ্ঠাবান চিকিৎসক ও কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু অসমকেই নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতকে গর্বিত করেছেন।”
 
কঠোর সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি মেজর কলিতা নিজের ফিটনেসের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেন। অবসর সময়ে তিনি বাগান করা, রান্না করা এবং সফট জ্যাজ সঙ্গীত শুনতে ভালোবাসেন। এছাড়াও, তিনি নিজের পোষ্য কুকুরগুলির সঙ্গে সময় কাটাতে ভীষণ পছন্দ করেন এবং এই নিরীহ প্রাণীগুলিকেই তিনি মানসিক চাপ কমানোর অন্যতম উৎস বলে মনে করেন।
 
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে চ্যালেঞ্জকে আপন করে নেওয়া মেজর কলিতার জীবনদর্শন তাঁরই একটি শক্তিশালী মন্তব্যে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “আপনি সমাজের গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকার জন্য এখানে আসেননি, আপনি এখানে এসেছেন সেই গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য।”
 
ঢেকিয়াজুলির মতো শান্ত শহর থেকে শুরু করে সম্মানীয় ‘মেরুন বেরেট’ অর্জন পর্যন্ত মেজর ডাঃ দ্বীপান্বিতা কলিতার যাত্রা অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি শুধু অসমের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপারই নন, বরং সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সেনার পোশাকে একজন ভারতীয় নারী কতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারেন, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।