শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ইতিহাস, সংস্কৃতি, অধিকার ও সম্প্রীতি—এই চারটি ভিন্ন প্রবাহকে যিনি নিজের জীবন ও কর্মের ভেতর একসূত্রে বেঁধেছেন, তিনি অধ্যাপক ড. সৈয়দ তানভীর নাসরিন। একদিকে তিনি ইতিহাসবিদ ও একাডেমিক গবেষক, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কূটনীতিক এবং নারীর অধিকার আন্দোলনের যুক্তিনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক সম্প্রীতির এক স্বাভাবিক জীবনদর্শন। এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তাঁকে সমকালীন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমানে অধ্যাপক ড. সৈয়দ তানভীর নাসরিন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং নারী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক-ইন-চার্জ। গবেষণা ও শিক্ষাদানের পাশাপাশি তাঁর কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় জুড়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক কূটনীতি। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি মালদ্বীপের রাজধানী মালে-তে অবস্থিত ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার) ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে ভারত ও মালদ্বীপের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানো, ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির পরিচিতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং দুই দেশের সম্পর্কের সফট পাওয়ার ভিত্তিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবেদনশীল কূটনৈতিক বাস্তবতায় সংস্কৃতিকে তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
একজন গবেষক হিসেবে তাঁর ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ভারতে মুসলিম নারীর পরিচয়’ বিষয়ের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তার দিশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লিঙ্গ, সংখ্যালঘু পরিচয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক—এই বিষয়গুলোই তাঁর গবেষণা ও লেখালেখির মূল কেন্দ্র। তিনি তিনটি গ্রন্থের লেখক, পাঁচটি গ্রন্থের সম্পাদক এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ।

তাঁর কাজের একটি ব্যতিক্রমী দিক হল সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা। এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রাচীন ভারতের ধর্মশাস্ত্রগুলিতে নারীর অবস্থান নিয়ে সমালোচনামূলক পাঠ করেছেন, যা ভারতীয় সমাজে নারী অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি শ্রীপাট শ্রিখণ্ড অঞ্চলে সংরক্ষিত সংস্কৃত-বাংলা পাণ্ডুলিপির একটি বর্ণনামূলক ক্যাটালগ প্রস্তুত করেন তিনি, যা ইতিহাস ও সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
একাডেমিক পরিসরের বাইরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধ্যাপক নাসরিন সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন সামাজিক আন্দোলন ও নীতি-আলোচনায়। ভারতীয় মুসলিম নারীদের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি বরাবরই স্পষ্ট ও যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিত করে তোলে। গবেষণা ও বাস্তব সামাজিক আন্দোলনের এই যোগসূত্র তাঁর কাজকে কেবল তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব প্রাসঙ্গিকতায়ও সমৃদ্ধ করেছে।

মালদ্বীপে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়মিতভাবে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্ক, আঞ্চলিক রাজনীতি, ভারত-বিরোধী বয়ান এবং চীনের প্রভাব নিয়ে মতামত ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। সাংস্কৃতিক কূটনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে—সংস্কৃতি অনেক সময় রাজনৈতিক ভাষার চেয়েও গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তাঁর পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে ব্যক্তিজীবনে। অধ্যাপক ড. সৈয়দ তানভীর নাসরিন একজন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী এবং থিয়েটারের গভীর অনুরাগী। শিল্পচর্চা তাঁর গবেষণা ও সামাজিক ভাবনার সঙ্গে মিশে গিয়ে তাঁকে একটি সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে তাঁর জীবন নিজেই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনসঙ্গী সুমন ভট্টাচার্য একজন সুপরিচিত সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাঁদের পারিবারিক জীবন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যের এক স্বাভাবিক ছবি তুলে ধরে।

দুর্গাপূজার সময় তিনি যেমন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে সম্পূর্ণভাবে অংশ নেন—সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন—তেমনই নিজের বাড়িতে আয়োজিত জগদ্ধাত্রী পূজার প্রস্তুতিতেও সমানভাবে সক্রিয় থাকেন। ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেওয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীতে স্বপরিবারে বন্ধু ও পরিজনদের শুভেচ্ছা জানানো—এই সবকিছুর মধ্যেই প্রতিফলিত হয় তাঁর বাবা-মায়ের দেওয়া শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। ধর্ম, জাতি বা বর্ণের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের উৎসব ও সম্পর্ককেই তিনি বড় করে দেখেন।

গবেষণা, সাংস্কৃতিক কূটনীতি, অধিকার আন্দোলন এবং সম্প্রীতির জীবনদর্শনের সম্মিলনে অধ্যাপক ড. সৈয়দ তানভীর নাসরিনের এই বহুমাত্রিক পথচলা তাঁকে সমকালীন সমাজে এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে—যেখানে জ্ঞান, মানবিকতা ও সহাবস্থান একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।