দর্জি পিয়ার আলির অনন্য দেশপ্রেম

Story by  Ariful Islam | Posted by  Aparna Das • 9 d ago
দর্জি পিয়ার আলি
দর্জি পিয়ার আলি
 
আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

তাঁর নাম পিয়ার আলি। পেশায় একজন দর্জি। কিন্তু প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবস এলেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক গর্বিত ভারতবাসী। দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের অনন্য নিদর্শন হিসেবে ১৫ আগস্ট ও ২৬ জানুয়ারির প্রাক্কালে পিয়ার আলি নিজের হাতে সেলাই করে প্রস্তুত করেন ভারতের জাতীয় পতাকা, ত্রিবর্ণ পতাকা।
 
প্রায় তিন দশক ধরে প্রজাতন্ত্র দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের আগে জাতীয় পতাকায় ভরে ওঠে তাঁর দোকান। গভীর আবেগ ও নিখুঁত যত্নে তিনি সেলাই করে চলেছেন দেশের তেরঙ্গা। প্রতিটি পতাকা যেন গৌরব ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, সেদিকে তিনি বিশেষ মনোযোগ দেন। শুরুতে অল্প সংখ্যক পতাকা তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্ট ঘনিয়ে এলে তাঁর দেশপ্রেম আরও গভীর হয়ে ওঠে এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে পতাকা তৈরির কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করে ফেলেন।
 

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দর্জি পিয়ার আলি বলেন, “আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে দর্জির কাজ করছি। দোকান শুরু করার এক বছর পর থেকেই, অর্থাৎ প্রায় ২৯ বছর ধরে, আমি জাতীয় পতাকা সেলাই করে আসছি। আমাদের জাতীয় পতাকা আমার ভীষণ প্রিয়, কারণ এটি আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। ছোটবেলায় আমরা একটি ছড়া পড়তাম, ‘‘তিনি বরণীয়া জাতীয় পতাকা নীল আকাশত নাচে, ওপরে গেরুয়া, মাজত শুকুলা, তলত শ্যামল আছে।’ এই পংক্তিগুলোর গভীর অর্থই আমার মনে জাতীয় পতাকার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা গেঁথে দিয়েছে।”
 
তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্টের জন্যই আমি পতাকা সেলাই করি। বাকি সময়ে অন্যান্য দর্জিদের মতোই কাপড় সেলাই করি। স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমি এই পতাকা বিক্রি করি। যেহেতু এই পতাকা আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাই আমি এর জন্য বেশি টাকা নিই না, শুধু কাপড়ের দামটাই নিই। যাতে সবাই কম দামে ভালো মানের পতাকা কিনে উত্তোলন করতে পারে, এটাই আমার উদ্দেশ্য। বৃহত্তর কালগাছিয়া এলাকায় একমাত্র আমিই পতাকা সেলাই করি।”
 
প্রজাতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে পিয়ার আলির দোকান 
 
প্রজাতন্ত্র দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে পিয়ার আলির দোকান তেরঙ্গায় ভরে ওঠে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কালগাছিয়ার পিয়ার আলি। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ তাঁর কাছ থেকে জাতীয় পতাকা সংগ্রহ করেছেন।
 
পিয়ার আলির দোকানের পাশের এক ব্যবসায়ী বলেন, “প্রায় ২৫ বছর ধরে আমি পিয়ার আলির পাশেই ব্যবসা করছি। এই ২৫ বছর ধরে দেখে আসছি, ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্ট এলেই পিয়ার আলির ব্যস্ততা বেড়ে যায়, তিনি দিনরাত পতাকা সেলাই করেন। একদিন আমি তাঁকে পতাকার দাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ বলিদান দিয়েছেন, তাঁদের নামেই আমি এই কাজ উৎসর্গ করেছি। তাই আমি শুধু কাপড়ের দামটাই নিই।’ উল্লেখযোগ্য যে, গোলপাড়া-সহ আশপাশের তিনটি জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংস্থা পিয়ার আলির কাছ থেকেই পতাকা সংগ্রহ করে।”
 
দর্জি পিয়ার আলি পতাকা সেলাই করার মুহূর্তে
 
উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ ব্যাপক রূপ নিয়েছে। পিয়ার আলির তৈরি পতাকা এখন কেবল বৃহত্তর কালগাছিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বরপেটা, বরভিটা, মায়ানবাড়ি, জয়পুর, তারকান্দি, বাঘবর, গোলপাড়া ও বঙ্গাইগাঁও, এই সব অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। খুব কম দামে তাঁর ব্যতিক্রমী কাজ কিনতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। প্রতিটি পতাকায় তিনি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সেলাই করে দেন, তা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন।