শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে গড়ে ওঠা বাংলার সমাজ আজ যখন বিভাজন ও মেরুকরণের চাপে ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কায়, তখন কিছু মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক উদ্যোগ সেই বহুত্ববাদী চেতনাকেই বাঁচিয়ে রাখছে। তেমনই এক নাম সায়রা শাহ হালিম, যিনি সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
১৯৭৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম সায়রা শাহ হালিমের। তিনি বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহের ভ্রাতুষ্পুত্রী। তবে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে, নিজের সমাজভাবনা ও কর্মের মাধ্যমেই তিনি আজ পরিচিত। তাঁর বাবা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জামির উদ্দিন শাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। বাবার কর্মসূত্রে দেশের নানা প্রান্ত ও বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা সায়রার শৈশবকে করে তোলে বহুমাত্রিক।
নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ থেকে শুরু করে সৌদি আরব, কুয়েত ও ইয়েমেনে কাটানো শৈশব তাঁকে খুব কাছ থেকে নানা সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা ও মানুষের জীবনসংগ্রাম দেখার সুযোগ দেয়। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর চিন্তাভাবনাকে সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।
শিক্ষাজীবন শেষে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর তিনি কর্পোরেট ক্ষেত্রে কাজ করেন। পেশাগত সাফল্য ও আরামদায়ক জীবনের মাঝেও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় বাবার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সেই সময়কার বাস্তবতা সায়রার মনে গভীর ছাপ ফেলে। পাশাপাশি তাঁর শ্বশুর, প্রয়াত হাশিম আবদুল হালিম, দীর্ঘদিনের বিধানসভা অধ্যক্ষ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতীক, তাঁর মধ্যে সামাজিক ন্যায় ও গণতান্ত্রিক চর্চার বোধকে আরও দৃঢ় করেন।
সায়রা শাহ হালিম
সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সায়রা শাহ হালিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে। তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত কলকাতা স্বাস্থ্য সংকল্প নামক সংস্থার সঙ্গে, যেখানে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে ডায়ালিসিস পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়। বহু দরিদ্র ও নিম্ন- মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এই পরিষেবা জীবনরক্ষাকারী হয়ে উঠেছে। সায়রা বিশ্বাস করেন, স্বাস্থ্যসেবা দান নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁর সমাজকল্যাণমূলক ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি ভারতের প্রাচীনতম পারস্য গবেষণা কেন্দ্র ইরান সোসাইটি–র আজীবন সদস্য। মধ্য কলকাতায় অবস্থিত তাঁর বাসভবনটি ধীরে ধীরে এক উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানে নিয়মিতভাবে দাস্তানগোই, বই পাঠ, আলোচনা সভা এবং নবীন ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আসর বসে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভাষা, সংস্কৃতি ও মতের মুক্ত বিনিময়কে তিনি সমাজগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছেন।
সায়রা শাহ হালিম তাঁর বই 'Comrades and Comebacks' - এর উন্মোচন অনুষ্ঠানে
সমাজকল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে সায়রার অবস্থান সরাসরি যুক্ত রাজনৈতিক সচেতনতায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) ও এনআরসি–বিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের প্রতি সংহতি এবং সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একটি দৃশ্যমান সামাজিক মুখে পরিণত করেছে। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি মূলত বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো মৌলিক সমস্যাগুলি আড়াল করার কৌশল।
২০২২ সালের মার্চ মাসে বালিগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ সমাজ ও রাজনীতির এই সংযোগকেই স্পষ্ট করে। যদিও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি, তবু ঐ আসনে বামপন্থীদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেকের চোখে এটি ছিল বাম রাজনীতির
এক ‘অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন’।
সায়রা শাহ হালিম একটি অনুষ্ঠান বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে
২০২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বই Comrades and Comebacks–এ সায়রা শাহ হালিম বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটির ভাবনাতেও সমাজকল্যাণ, সমতা ও বিকল্প সামাজিক কাঠামোর প্রশ্নটি কেন্দ্রে রয়েছে।
নিজেকে তিনি কোনো ত্রাণকর্তা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘ সামাজিক লড়াইয়ের এক অংশ হিসেবেই দেখেন।স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর নিরলস কর্মপ্রয়াস তাঁকে সমতা ও অন্তর্ভুক্তির পক্ষে এক অনুপ্রেরণাদায়ক কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কলকাতার সীমা ছাড়িয়ে তাঁর এই সমাজকল্যাণমূলক ভাবনা আজ জাতীয় স্তরেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, যেখানে মানবিকতা ও সহাবস্থানই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।