শ্রীলতা এম / ত্রিশূর
গত বছরের আগস্টে ত্রিশূর কর্পোরেশনের কন্নানকুলাঙ্গারা ওয়ার্ডে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর একটি নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। বিজেপি প্রার্থী হিসেবে মুমতাজ থাহা জয়ী হয়ে ত্রিশূর কর্পোরেশনের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী কাউন্সিলর হন। এই জয়ের বিশেষ তাৎপর্য আরও একটি কারণে, ওয়ার্ডটির প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের।
তবে মুমতাজ থাহার মতে, তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় ধর্মীয় পরিচয় কখনোই প্রধান বিষয় ছিল না। তিনি বলেন, “ভোটারদের কাছে কিংবা দলের কাছে আমি শুধু একজন মুসলিম ছিলাম না, আমি ছিলাম কন্নানকুলাঙ্গারার মেয়ে।” ছোটবেলা থেকে ওই এলাকায় বেড়ে ওঠার কারণে মানুষের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটিই তাঁকে নানা সংশয় ও কৌতূহলের মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁকে বারবার একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কেন তিনি বিজেপিতে যোগ দিলেন। কন্নানকুলাঙ্গারা ওয়ার্ডে আগে একজন হিন্দু বিজেপি কাউন্সিলর প্রতিনিধিত্ব করতেন। ফলে নতুন প্রার্থীর পরিচয় অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে ওঠে। থাহা স্মরণ করেন, “মানুষ জানতে চাইছিল আমি কে এবং কেন এখানে দাঁড়িয়েছি।”
৩৮ বছর বয়সী থাহা জানান, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে তিনি একই বাড়িতে একাধিকবার গিয়েছেন। “দ্বিতীয়বার গেলে মানুষ নানা প্রশ্ন করত। তৃতীয় বা চতুর্থবার গেলে কথাবার্তা অনেক সহজ হয়ে যেত,” বলেন তিনি। এলাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিতি ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করে এবং ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, শুরুতে নির্বাচনে দাঁড়ানোর কোনও পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। পরিবারে তামিলনাড়ুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় ছোটবেলা থেকেই তিনি তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জে. জয়ললিতার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে শুনে বড় হয়েছেন। এখনও তিনি স্নেহভরে তাঁকে ‘জয়াম্মা’ বলে উল্লেখ করেন। চেন্নাইয়ে থাকা তাঁদের পরিবারের অনেক বন্ধু এআইএডিএমকের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং রাজনৈতিক আলোচনা তাঁর শৈশবের পরিবেশেরই অংশ ছিল।
২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পর সেই বন্ধুদের অনেকেই এআইএডিএমকে ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁদেরই একজন মুমতাজ থাহার নাম দলের নেতৃত্বের কাছে প্রস্তাব করেন, কারণ তিনি জনজীবন ও সামাজিক বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলেও তামিলনাড়ুতে তাঁর দলীয় সম্পৃক্ততা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক বছর পর তিনি আবার ত্রিশূরে ফিরে আসেন।
মুমতাজ থাহা
কেরালায় রাজনৈতিক কাজ শুরু করার জন্য তাঁকে উৎসাহ দেন তাঁর বাবা। তিনি বলেন, “বাবা চেয়েছিলেন আমি এখানেই অভিজ্ঞতা অর্জন করি, সংসদ নির্বাচনের কাজ দিয়ে শুরু করি।” ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অভিনেতা সুরেশ গোপি যখন ত্রিশূর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন, সেই সময় থেকেই থাহা বিজেপির হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে শুরু করেন। তাঁর মতে, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে কর্পোরেশন নির্বাচনে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
কেন তিনি বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন, এই প্রশ্ন এখনও তাঁকে তাড়া করে। থাহা স্বীকার করেন, এই পথ সহজ ছিল না। দলের কিছু অংশ এবং তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেও সংশয় ছিল। তিনি বলেন, “বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন, বিশেষ করে আমি এখানে শুরু থেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।” এমনকি তাঁর কয়েকজন আত্মীয়ও তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট।
বিজেপিকে সংখ্যালঘু-বিরোধী বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তা তিনি নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না বলে মনে করেন। তাঁর কথায়, “আমার সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ এখনও পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তবে ধীরে ধীরে, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মধ্যে মনোভাব বদলাচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ত্রিশূরে বিজেপির জেলা সভাপতি একজন খ্রিস্টান, তাই দলটিকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়।
বর্তমানে মুমতাজ থাহা বিজেপির মাইনরিটি মোর্চার সঙ্গে যুক্ত। মুসলিম নারীদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করাকে তিনি নিজের অগ্রাধিকারের মধ্যে রেখেছেন। তাঁর মতে, “শিক্ষা নারীদের নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস দেয়।”
প্রথমবার কাউন্সিলর হওয়ার পর তাঁর দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে পরিবারের জন্য খুব বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয় না বলে তিনি জানান। তাঁর ১৩ বছরের ছেলের দেখাশোনা করতে তাঁর মা সাহায্য করেন। স্বামী এবং বাবা, যাঁরা একসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাঁরাই তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক।
মুমতাজ থাহা নিজের ওয়ার্ডেই ‘নালা’ নামে একটি পেট গ্রুমিং সেন্টার পরিচালনা করেন। সোয়াহিলি ভাষায় ‘নালা’ শব্দের অর্থ ‘রানী’। এই কেন্দ্র থেকেই তিনি অনেক সময় সভা, আলোচনা এবং বিভিন্ন যোগাযোগের কাজও পরিচালনা করেন।
প্রথমবার কাউন্সিলর হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের নানা দিক এখনও তিনি শিখছেন। সামনে বিধানসভা নির্বাচন আসায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্রমশ বাড়ছে। তিনি বলেন, “আগামী কয়েক মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি পরিবারকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে আমি খুব ব্যস্ত থাকব।”
জয়ললিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তাঁর সঙ্গে নিজের তুলনা করতে তিনি নারাজ। থাহা বলেন, “জয়ললিতার মতো হতে গেলে আগুনের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়। তাঁর কোনও বিকল্প নেই।” তবে তাঁর কাজের একটি দিক তিনি অনুসরণ করতে চান, তৃণমূল স্তর থেকে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা।
নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টিকে খুব বড় করে দেখেন না। তাঁর কথায়, “আমি এখন শুধু এই পাঁচ বছর নিয়ে ভাবছি। দল ও ভোটারদের আস্থা অর্জন করাই আমার লক্ষ্য। নেতৃত্ব মানে চিরকাল একটি পদে বসে থাকা নয়।”
এই মুহূর্তে মুমতাজ থাহার মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিজের ওয়ার্ডের কাজের দিকে। এলাকার সমস্যা সমাধান করা, বিজেপির সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন গড়ে তোলাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
ওয়ার্ডের কাজ এবং নিজের গ্রুমিং সেন্টারের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতেই তিনি নিয়মিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে শেখা একটি বিষয় তিনি সবসময় মনে রাখেন, অর্থবহ রাজনীতি সবসময় তৃণমূল স্তর থেকেই শুরু হয় এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উপরের দিকে এগিয়ে যায়।