দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এবং কঠিন বলে বিবেচিত ইউপিএসসি (UPSC) অসামরিক পরিষেবা পরীক্ষা-র সাম্প্রতিক ফলাফলে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র সামনে এসেছে। এবারের ফলাফল বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সেই মুসলিম মহিলা শিক্ষার্থীদের দিকে, যারা শীর্ষ ২৫টি স্থানের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। তবে এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মুসলিম মহিলারা ধারাবাহিকভাবে এই পরীক্ষায় সাফল্যের পতাকা উড়িয়ে চলেছেন। তাঁরা শুধু সফলই হননি, বরং মুসলিম মহিলারা কেবল ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এই দীর্ঘদিনের ধারণাকেও ভেঙে দিয়েছেন।
জাকাত ফাউন্ডেশনের জফর মাহমুদ একবার যথার্থই বলেছিলেন, নারীর জীবন শুধু ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার দিন এখন অতীত। সময় বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মুসলিম মহিলারাও আজ পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিকও। কারণ একজন নারী যখন প্রশাসনিক পরিষেবায় প্রবেশ করেন, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, নিজের পরিবার ও সমাজের জন্যও অগ্রগতির নতুন দিগন্ত খুলে দেন। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ফলাফল দেখলে বোঝা যায় যে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS) এবং ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (IPS)-র মতো মর্যাদাপূর্ণ পরিষেবায় এই কন্যাদের উপস্থিতি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এই সাফল্যের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো তাঁদের পারিবারিক পটভূমি। এই তরুণীরা কোনো ঐশ্বর্যশালী পরিবার থেকে আসেননি; বরং ছোট শহর ও সীমিত আর্থিক সামর্থ্যসম্পন্ন পরিবার থেকেই উঠে এসেছেন। কারও বাবা অটো-রিকশা চালক, আবার কারও বাবা একটি ছোট দোকানের ব্যবসায়ী। তাঁদের গল্প প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে অভাবের মধ্য থেকেও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
মহারাষ্ট্রের যবতমাল জেলার আদিবা অনমের গল্প সংগ্রামের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর বাবা ভাড়ায় অটো-রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন এবং পুরো পরিবার একটি ছোট ভাড়া বাড়িতে বাস করত। আদিবার প্রথম স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার, কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য পথ বেছে রেখেছিল। তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। অবশেষে ২০২৪ সালের ফলাফলে ১৪২তম স্থান অর্জন করে তিনি দেখিয়ে দেন যে একজন সাধারণ রিকশাচালকের মেয়েও দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পরিষেবায় পৌঁছাতে পারে।
একইভাবে অনুপ্রেরণামূলক আরেকটি গল্প হল বারাণসীর আরফা উসমানির। তাঁর বাবা আসলাম খান বারাণসীর একটি ছোট দোকানে ক্রোকারি সামগ্রী বিক্রি করেন। আরফা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। তিনি ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (BHU) থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। ভালো চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সমাজসেবার পথ বেছে নেন। কোনো বড় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহায়তা ছাড়াই নিজের প্রচেষ্টায় প্রস্তুতি নিয়ে চতুর্থ প্রচেষ্টায় ১১১তম স্থান অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্য সেই অসংখ্য তরুণীর জন্য আশার আলো, যারা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে নিজেদের দুর্বলতা বলে মনে করে।
প্রতীকী ছবি
কলকাতার সাইমা খানের গল্প ধৈর্য ও একাগ্রতার এক অসাধারণ উদাহরণ। মোমিনপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সাইমা প্রস্তুতির সময় নিজেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাইরের পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বহু বছর বিয়ে-শাদি, আত্মীয়স্বজনের অনুষ্ঠান এবং সামাজিক মাধ্যম থেকেও দূরে ছিলেন। তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি থামেননি। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় ১৬৫তম স্থান অর্জন করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন। তাঁর বিশ্বাস, সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই; প্রতিটি ব্যর্থতা মানুষকে বিজয়ের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও কয়েকটি নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ইফরা শামস আনসারী ২০২৫ সালের ফলাফলে ২৪তম স্থান অর্জন করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অন্যদিকে নওশিন (ক্রম ৯) এবং ওয়ারদাহ খান (ক্রম ১৮)-এর মতো মেধাবী প্রার্থীরা শীর্ষ ২০-র মধ্যে স্থান পেয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মুসলিম মহিলাদের সাফল্য এখন প্রত্যাশার সীমাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একইভাবে অবীর আসাদ, যিনি একজন মৌলানার কন্যা, কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাহায্য ছাড়াই স্বশিক্ষায় প্রস্তুতি নিয়ে ৩৫তম স্থান অর্জন করেছেন। যারা মনে করেন ধর্মীয় পরিবেশ ও উচ্চশিক্ষা একে অপরের পরিপন্থী, তাঁদের জন্য এটি একটি শক্ত জবাব।
ইউপিএসসি পরীক্ষায় মুসলিম প্রার্থী, বিশেষ করে মহিলাদের বাড়তে থাকা উপস্থিতি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। ২০২০ সালে যেখানে সদাফ চৌধুরী ২৩তম স্থান পেয়ে মুসলিম প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ফলাফলে ১৩ জনেরও বেশি মুসলিম মহিলা সফল হয়েছেন। ইরাম চৌধুরী (সর্বভারতীয় ক্রম ৪০) এবং ফারখন্দা কুরেশি (সর্বভারতীয় ক্রম ৬৭)-এর মতো নাম এখন সমাজে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রতীকী ছবি
গত কয়েক বছরের ফলাফলও একই প্রবণতার সাক্ষ্য দেয়। ২০২৫ সালে মোট প্রায় ৫৩ জন মুসলিম প্রার্থী সফল হন, যার মধ্যে ১৩ জনের বেশি মহিলা। ইফরা শামস আনসারী ২৪তম স্থান অর্জন করেন। ২০২৪ সালে মুসলিম মহিলাদের মধ্যে ইরাম চৌধুরী সর্বভারতীয় ক্রম ৪০, ফারখন্দা কুরেশি সর্বভারতীয় ক্রম ৬৭ এবং আদিবা অনম সর্বভারতীয় ক্রম ১৪২ পান। ২০২৩ সালে নওশিন সর্বভারতীয় ক্রম ৯, ওয়ারদাহ খান সর্বভারতীয় ক্রম ১৮ এবং সাইমা খান সর্বভারতীয় ক্রম ১৬৫ স্থান অর্জন করেন। ২০২২ সালে আয়শা ফাতিমা সর্বভারতীয় ক্রম ১৮৪ এবং কাজি আয়শা ইব্রাহিম সর্বভারতীয় ক্রম ৫৮৬ স্থান লাভ করেন। এই পরিসংখ্যান পরিষ্কারভাবে দেখায় যে মুসলিম মহিলারা ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক পরিষেবায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন।
এই সাফল্য মুসলিম সমাজে শিক্ষার প্রতি এক নতুন সচেতনতারও ইঙ্গিত দেয়। আজ কন্যারা শুধু স্নাতক হওয়ার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন না; বরং নীতি নির্ধারণ ও প্রশাসনের অংশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। সমাজের বহুদিনের বাঁধনকে তাঁরা নিজেদের উড়ানের শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাঁদের সাফল্য শুধু তাঁদের পরিবারকে দারিদ্র্যের সীমা থেকে তুলে আনেনি, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য এমন এক অনুপ্রেরণার প্রদীপ জ্বালিয়েছে, যা সহজে নিভে যাওয়ার নয়। আজ এই নারীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, সুযোগ ও সঠিক মঞ্চ পেলে তাঁরাও আকাশ ছুঁতে পারেন।