ক্ষমতা নয়, দায়িত্ববোধ ও বিশ্বাসের প্রতীক: ব্যতিক্রমী পুলিশ আধিকারিক নাজমা ফারুকি

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 5 h ago
 ব্যতিক্রমী পুলিশ আধিকারিক নাজমা ফারুকি
ব্যতিক্রমী পুলিশ আধিকারিক নাজমা ফারুকি
 

সানিয়া আঞ্জুম

কিছু নেতা নির্দেশ দিয়ে অনুপ্রাণিত করেন।অন্যরা বিশ্বাস ও দৃঢ়তার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করেন।নাজমা ফারুকি বিরল সেই দ্বিতীয় শ্রেণির নেতাদের একজন।তিনি এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা, যার কর্তৃত্ব সহমর্মিতা ও সততার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।তিনি এমন নেতৃত্বের প্রতীক, যেখানে ক্ষমতা কখনও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়,এবং সেবা মানবতা থেকে আলাদা নয়।

নাজমার পুলিশে আসার যাত্রা ইউনিফর্ম পরার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।এর সূচনা হয়েছিল তাঁর নিজের বাড়িতে।তিনি তাঁর বাবাকে দেখেই বড় হয়েছেন, যাঁকে তিনি একজন কিংবদন্তি ও দূরদর্শী মানুষ বলে বর্ণনা করেন।তাঁর বাবার গল্প, অভিজ্ঞতা এবং মূল্যবোধ নীরবে নাজমার দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্তব্যবোধ গড়ে তোলে।তাঁর পাশে ছিলেন তাঁর মা,যাঁর বিনয় ও অন্তর্নিহিত শক্তি নাজমার মানসিক ভরসা হয়ে ওঠে।তিনি বলেন,“আমার মা সবসময় আমাকে বিনয়ী ও মাটির কাছাকাছি থাকতে শিখিয়েছেন।তাঁর কার্যকর শক্তি, অন্তরের দৃঢ়তা এবং আমার প্রতি অটল বিশ্বাস সবসময়ই আমার অনুপ্রেরণার উৎস।”

মহাবিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মুহূর্তে নাজমা ফারুকি
 
শৈশব থেকেই নাজমা ছিলেন গভীর চিন্তাশীল ও কৌতূহলী।তিনি মনে করেন, তিনি এমন প্রশ্ন করতেন যা সাধারণ ভাবনার বাইরে ছিল।তার মধ্যে একটি প্রশ্ন বহু বছর ধরে তাঁর মনে রয়ে যায়।“আমি ভাবতাম, মানুষের নাম কেন রাখা হয় এবং একটি নাম কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে।”নাজমা নামের অর্থ আরবিতে ‘তারা’।এই নাম ধীরে ধীরে তাঁর কাছে উজ্জ্বলতা ও পথনির্দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে।কিন্তু তাঁর বাবার কাছে এই শব্দগুলোর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত ছিল।তিনি তাঁকে বলতেন,“সঠিক পথ দেখাতে হলে নিজের কাজের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হতে হবে।”

এই ভাবনা নাজমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।তিনি বলেন,“পথনির্দেশের বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলত।কেউ কেন তোমাকে অনুসরণ করবে, যদি তুমি নিজের মধ্যে সেই যোগ্যতা তৈরি না করো?”এই প্রশ্নই নীরবে কিন্তু শক্তিশালীভাবে তাঁর পেশাগত জীবনকে গড়ে তুলেছে।নাজমা ফারুকির কাছে পুলিশি কাজ ক্ষমতার বিষয় নয়।এটি বিশ্বাসের বিষয়।তিনি বলেন,“যখন আমরা একজন অফিসার, বিশেষ করে একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার কথা বলি, মানুষ তখন ক্ষমতার কথা ভাবে।কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এটি হলো বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃত্ব।”তিনি নিজের ভূমিকাকে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে দেখেন।আইনকে ব্যবহার করে তিনি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সুযোগ, সুরক্ষা এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চান।তিনি বলেন,“সেখানেই আমি নিজেকে পথপ্রদর্শক হিসেবে খুঁজে পাই।নিজের ওপর বিশ্বাস গড়ে তোলার এক নতুন ঢেউ সৃষ্টি করা।”ইউনিফর্ম বা পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তাঁর মূল মূল্যবোধ সবসময় একই থাকে।তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন,শক্তিশালী নৈতিক আদর্শ, সহমর্মিতা, সততা, নীতিনিষ্ঠ পুলিশি কাজ, সেবার প্রতি নিষ্ঠা এবং পেশাদার আচরণ—এসবের সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না।তিনি বলেন,“এই মূল্যবোধগুলোই আমাকে একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে গড়ে তোলে এবং আরও শক্তিশালী করে।”এই আদর্শই দায়িত্ব পালনকালে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর সিদ্ধান্তকে পরিচালিত করে।

কর্তব্যরত অবস্থায় নাজমা ফারুকি
 
 
ক্রমবিন্যাসভিত্তিক একটি বাহিনীতে কাজ করেও নাজমা দলগত কাজ ও যোগাযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।তিনি বিশ্বাস করেন, শৃঙ্খলা পুলিশি কাজের মেরুদণ্ড, কিন্তু বোঝাপড়াই তার আত্মা।তিনি ব্যাখ্যা করেন,“পুলিশের কাজ সবসময় দল হিসেবেই করা হয়।”মোতায়েনের আগে ও পরে তিনি শুধু নির্দেশ দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না,বরং ব্রিফিং ও পর্যালোচনার ব্যবস্থাও করেন।তিনি বলেন,“যখন দল বুঝতে পারে যে নিয়মগুলো কাজ সহজ করার জন্য তৈরি, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা মেনে চলা হয়।”যদিও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে,তিনি সেটিকে শেষ বিকল্প হিসেবেই দেখেন।তিনি আরও বলেন,“সংশোধনমূলক পদ্ধতি বেশি গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর।”

তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা, একজন নেতাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে।”তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাগুলোর একটি আসে প্রবেশনকালীন সময়ে টি এস হল্লিতে পোস্টিংয়ের সময়।তার আগে নাজমা কখনও থানায় যাননি এবং সিনেমা ও লোকমুখে শোনা ধারণার ভিত্তিতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের মতোই একটি ধারণা ছিল তাঁর।কিন্তু বাস্তব মানুষ ও বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যায়।
 
 

বান্ধবীর সঙ্গে নাজমা ফারুকি

 
তিনি বলেন,“সেই প্রথম আমি সত্যিকারের সাধারণ মানুষ, তাদের সমস্যা এবং দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলার জটের কারণে থানার প্রতি তাদের ভয়কে কাছ থেকে দেখি।”একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ঘটনায়, এক নিখোঁজ মেয়ের বাবা-মা অভিযোগ দায়ের করতে অনীহা দেখিয়েছিলেন।টানা বাহান্ন ঘণ্টা ধরে নাজমা ও তাঁর দল নিরলসভাবে কাজ করেন,তাদের বিশ্বাস অর্জন করেন, মেয়েটিকে খুঁজে বের করেন এবং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটান।সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন,“এটি জনসংযোগ, সহমর্মিতা, দলগত কাজ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, বোঝানো, জবাবদিহিতা এবং সবশেষে তৃপ্তি—সবকিছুরই গভীর শিক্ষা দিয়েছে। এই সব অনুভূতি ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়।”
 
 
এই ঘটনা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল এবং পুলিশি জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে।নাজমার কাছে জনসেবা অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়।তিনি এটিকে দেখেন মানুষের সঙ্গে সংযোগ, মাটির স্তরের বাস্তবতা বোঝা, বিশ্বাস গড়ে তোলা, সহমর্মিতা এবং সক্রিয়ভাবে সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে।তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের মানুষদের ক্ষণিকের হস্তক্ষেপ নয়, বরং দিকনির্দেশনা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন।তিনি বলেন,“মূল কারণগুলো উপলব্ধি করা এবং বিস্তৃত মানসিকতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবা ও পুনর্গঠন করাই সময়ের দাবি।”তাঁর দৃষ্টিতে, দক্ষ চিন্তাশীল মানুষ ও সমাজের নেতাদের যৌথ উদ্যোগ স্থায়ী ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারে।

পেশাগত দায়িত্বের বাইরে, নাজমা সহজ কিন্তু অর্থবহ কাজের মধ্যেই নতুন শক্তি খুঁজে পান।তিনি বলেন,“যখন আমি দায়িত্বমুক্ত থাকি, তখন আমার মন যেখানে শান্তি পায়, তা হলো আমার পরিবার।”ছোট ছোট ভাবনামূলক লেখা তাঁকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি আরও শাণিত করতে এবং ব্যক্তি হিসেবে বিকশিত হতে সাহায্য করে।তিনি শরীরচর্চা ও যোগব্যায়ামের মাধ্যমে শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখেন,যা তাঁর মতে তাঁকে “নতুন সূচনা এবং আত্মার আরোগ্যের” জন্য প্রস্তুত করে।ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেও তিনি গভীর তৃপ্তি অনুভব করেন।সাইবার নিরাপত্তা, মাদকাসক্তি এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি একজন অফিসারের ভূমিকা ছাড়িয়ে একজন পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকাও পালন করেন।

নাজমা ফারুকির জীবনযাত্রা এক শক্তিশালী সত্যকে তুলে ধরে।কার্যকর হতে কর্তৃত্বের উচ্চকণ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন নেই।যখন তা বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সততার ভিত্তিতে দাঁড়ায়,তখন সেটি রূপান্তরমূলক শক্তিতে পরিণত হয়।তাঁর হাতে পুলিশি কাজ কেবল আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকে না,বরং তা বিবেকসম্পন্ন নেতৃত্ব এবং উদ্দেশ্যনিষ্ঠ সেবায় রূপ নেয়।