কলম, ক্যামেরা আর কণ্ঠস্বরের লড়াইয়ে উজ্জ্বল নাম ফৌকিয়া ওয়াজিদ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 8 h ago
ফৌকিয়া ওয়াজিদ
ফৌকিয়া ওয়াজিদ
 
সানিয়া আঞ্জুম 
 
প্রতিটি মানুষের পরিচয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য গল্প। কিন্তু সেই গল্প যদি নিজের কণ্ঠে বলা না যায়, তবে সমাজ অন্যের ভাষাতেই তাকে চিনতে শেখে। এই সত্য খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন ফৌকিয়া ওয়াজিদ। তাই গতানুগতিক পথ এড়িয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন গণসংযোগের জগৎ এবং নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন আলাদা পরিচিতি। লেখিকা, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও ‘জুক ফিল্মস’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, সাফল্য মানে কেবল অন্যকে হারানো নয়, প্রতিদিন নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলাই আসল জয়। 
 
“আমি বড় হয়েছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে উৎকর্ষ মানে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রতিনিয়ত নিজের মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে তোলা,” বলছেন ফৌকিয়া ওয়াজিদ। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর নামের অর্থও যেন ঠিক সেটাই, ‘শ্রেষ্ঠত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া’। আরও মজার ব্যাপার হলো, পরিবারে জ্যোতিষবিদ্যায় বিশেষ বিশ্বাস না থাকলেও এক জ্যোতিষীই তাঁর জন্য আরবি নাম “ফৌকিয়া” প্রস্তাব করেছিলেন, যার অর্থ ‘উৎকর্ষ অর্জন করা’। পরিবার সেই বিশ্বাসে অনড় না থাকলেও নামটি রয়ে যায়, প্রায় ভবিষ্যদ্বাণীর মতোই, যা তাঁর জীবনের পথচলা ও আত্মোন্নয়নের অঙ্গীকারের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
 
ফৌকিয়া ওয়াজিদ
 
১৯৯২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এমন এক পরিবারে, যেখানে বিদ্যা, ভাষা ও বৌদ্ধিক কৌতূহল ছিল প্রতিদিনের জীবনের অংশ। তাঁর মা তখন সদ্য পিএইচডি গবেষণাপত্র সম্পন্ন করেছিলেন, যা ছোটবেলাতেই ফৌকিয়ার মনে গেঁথে দেয়, শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি এক নিরন্তর সাধনা।
 
সাহিত্যঘন পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে শিল্প ও সাহিত্য ফৌকিয়ার জীবনে আলাদা করে প্রবেশ করেনি, এগুলো ছিল তাঁর চারপাশের স্বাভাবিক আবহ। সাহিত্য ছিল না কোনও অতিরিক্ত কার্যকলাপ; বরং জীবনকে তার সমস্ত উত্থান-পতনসহ বোঝার একটি মাধ্যম। শৈশবের সাহিত্যসভা থেকে কবিতা ও চিন্তায় ভরা আলাপচারিতা, সবই খুব অল্প বয়সেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। লেখালেখি তাঁর কাছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি লেখেন তাঁর প্রথম কবিতা আকাশ। আর মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর ইংরেজি কবিতার সংকলন চিৎকারধ্বনি। ফিরে তাকিয়ে তিনি বলেন, “লেখা আমার কাছে কখনও পছন্দের বিষয় ছিল না, এটাই ছিল পৃথিবীকে বোঝার উপায়।”
 
গণযোগাযোগ বিষয়টি পড়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর কাছে যেমন সচেতন, তেমনই সাহসী। এমন এক সময়ে, যখন সৃজনশীল পেশাগুলোকে প্রায়ই অবাস্তব বলে মনে করা হতো, বিশেষত নারীদের জন্য, ফৌকিয়াকে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে নানাভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তিনি স্মরণ করেন, “যখন আমি গণযোগাযোগ বেছে নিয়েছিলাম, সবাই প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু আমি জানতাম, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। আপনি যদি নিজের বয়ান নিয়ন্ত্রণ না করেন, অন্য কেউ তা করবে।”
 
একটি স্ট্রিট প্লে করার মুহূর্তে
 
এরপর তিনি নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সেখানেই তিনি ছাত্রনেত্রী হিসেবেও উঠে আসেন এবং ছাত্র সংসদের সভাপতি হন। তাঁর নেতৃত্ব তখনও ক্ষমতার নয়, অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল।
 
মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফৌকিয়া একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল এক সামাজিক আন্দোলন। এর লক্ষ্য ছিল এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা যে তরুণদের মধ্যে গাম্ভীর্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, বিশেষত সৃজনশীল ক্ষেত্রে। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই এটি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, “তরুণদের প্রায়ই বলা হয়, নিজেদের সময়ের জন্য অপেক্ষা করো। আমি এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যেখানে বয়স নয়, প্রতিভাই মুখ্য।”
 
শীঘ্রই তাঁর সৃজনশীল যাত্রা মূলধারার গণমাধ্যমে প্রবেশ করে। ভায়াকমের অধীনে কালার্স কন্নড় (Colors Kannada)-এর প্রথম চারজন নির্বাচিত লেখকের একজন ছিলেন ফৌকিয়া। তিনি জনপ্রিয় ধারাবাহিক রাধা রমণ-এর ১৫০টিরও বেশি পর্বে অবদান রাখেন। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিরাপদ পথ ছেড়ে গল্প বলাকেই বেছে নেন।
 
এই পথই তাঁকে নিয়ে যায় মুম্বইয়ে, যেখানে তিনি ভায়াকম ১৮ মোশন পিকচার্স (Viacom 18 Motion Pictures)-এ প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন, সৃজনশীল ও উন্নয়ন বিভাগে। সারা ভারতের জন্য নির্মিত চিত্রনাট্য সামলানো এবং বড় প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। তবে বাণিজ্যিক সাফল্য কখনও তাঁর উদ্দেশ্যকে ম্লান করেনি। তিনি বলেন, “বড় প্ল্যাটফর্ম আপনাকে পৌঁছনোর সুযোগ দেয়, কিন্তু আপনার কাজের অর্থ ঠিক করে আপনার উদ্দেশ্য।”
 
ফৌকিয়া ওয়াজিদ
 
তাঁর গভীরতর টান ছিল তথ্যচিত্র নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে। কর্ণাটক উর্দু অ্যাকাডেমির অধীনে তিনি কর্ণাটকের বিশিষ্ট উর্দু সাহিত্যিকদের নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যাঁদের অনেকেই জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছিলেন। স্বামী রিজওয়ানের সঙ্গে মাদুরাইয়ে ১৬ মিলিমিটার ফিল্ম প্রকল্পেও কাজ করেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ফৌজিয়া নামা, তাঁর মা ফৌজিয়া চৌধুরীকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। তিনি বলেন, “এই ছবি শুধু আমার মাকে নিয়ে নয়, এটি সেই প্রজন্মের নারীদের দলিল, যাঁদের বৌদ্ধিক শ্রম প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়।”
 
বর্তমানে জুক ফিল্মস (Zooq films)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ফৌকিয়া শিল্পসত্তা ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছেন। স্বাধীন তথ্যচিত্র নির্মাণ থেকে শুরু করে নামী সংস্থার সঙ্গে কাজ, সবকিছুর মধ্যেই তিনি দেখিয়েছেন অর্থবহ বিষয়বস্তু ও বাণিজ্যিক কাজ পাশাপাশি চলতে পারে।তাঁর নেতৃত্বের ধরন গড়ে উঠেছে সহমর্মিতা ও পরামর্শদানের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, “জায়গা খুঁজে পাওয়া কত কঠিন, আমি জানি। তাই যখন আমি নেতৃত্ব দিই, আমার প্রথম দায়িত্ব থাকে, সব কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায়।”
 
ফৌকিয়ার কাজের কেন্দ্রে বারবার উঠে আসে নারী, প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক মানসিকতার প্রশ্ন। বিভিন্ন শ্রুতিচর্চা অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন এবং নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি ভাঙতে উৎসাহ দেন। তাঁর কথায়, “নারীদের অসীম সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সামাজিক শর্ত, অলসতা ও ভয় প্রায়ই তাদের আটকে রাখে। আর হ্যাঁ, নারীদের জন্য সবকিছু দশগুণ কঠিন।” তবুও তিনি আশাবাদী, বিশেষত ডিজিটাল যুগকে ঘিরে। তিনি বলেন, “ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল মাধ্যম খেলার নিয়ম বদলে দিয়েছে। আজ নারীরা পুরুষপ্রধান দুনিয়ায় নিজেদের বিষয়বস্তু নিজেরাই তৈরি করতে পারছে।”
 

নীরবতার পরিণতি সম্পর্কেও তিনি গভীরভাবে সচেতন। “প্রতিনিধিত্বের অভাব এমন সব বয়ান তৈরি করে, যেগুলো আমরা প্রশ্ন না করেই মেনে নিই,” সতর্ক করেন ফৌকিয়া। “যখন আমাদের গল্প অনুপস্থিত থাকে, তখন অন্যরা আমাদের সংজ্ঞায়িত করে।” এই বিশ্বাসই তাঁকে গণযোগাযোগকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখায়। তিনি বলেন, “রেডিও ও টেলিভিশনের গতি হয়তো কমেছে, কিন্তু গল্প বলা থেমে যায়নি। বিষয়বস্তু তৈরি করুন, মাধ্যম ব্যবহার করুন। সাংবাদিকতা, রাজনীতি বা গণমাধ্যম আপনার জন্য নয়, এ কথা বলার অধিকার কারও নেই।”
 
জীবনের নতুন দশকে পা রেখে, গণযোগাযোগে পিএইচডি করতে করতে এবং নিজের সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করে তুলতে গিয়ে, সাফল্যের অর্থও তাঁর কাছে বদলে গেছে। তিনি বলেন, “আজ সাফল্য মানে প্রভাব। আপনার কাজ সচেতনতা তৈরি করছে কি না, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে কি না, কাউকে শক্তি দিচ্ছে কি না, সেটাই আসল।”
 
বহু বছর পরে যখন ফৌকিয়া ওয়াজিদের নাম স্মরণ করা হবে, তখন তা শুধু সৃজনশীল উৎকর্ষের জন্য নয়, সাহসের জন্যও স্মরণীয় হবে। অপ্রচলিত পথ বেছে নেওয়ার সাহস, বিস্মৃত কণ্ঠস্বরকে নথিবদ্ধ করার সাহস, এবং প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বে দৃঢ় থাকার সাহস। তাঁর নিজের ভাষায়, “গল্প সমাজকে গড়ে তোলে। আর যদি আমরা নিজেদের গল্প না বলি, তবে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করার অধিকারও হারিয়ে ফেলি।”