ড. জাহিদা খান
সানিয়া আঞ্জুম
হুবলির নীরব অলিগলিতে, যেখানে পুরনো রীতি আর নতুন সময়ের পরিবর্তন একসঙ্গে পথ চলে, সেখানেই জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্নবতী কিশোরী। সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে বড় কিছু করার সাহস সে লালন করেছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই কিশোরীই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ড. জাহিদা খান, শিক্ষাবিদ, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, সমাজনেত্রী এবং আজীবন জ্ঞানসন্ধানী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন কেবল সাফল্যের ইতিহাস নয়, বরং অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষার শক্তির এক অনুপ্রেরণাদায়ক দলিল।
হুবলিতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ড. জাহিদা খান পড়াশোনা করেন অ্যাংলো-উর্দু হাই স্কুলে। এই প্রতিষ্ঠানই তাঁর মনে প্রথম স্বপ্নের বীজ বপন করেছিল। বহু বছর পরে, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সাফল্য অর্জনের পর, তিনি আবার ফিরে আসেন সেই স্কুলেই, নস্টালজিয়ার টানে নয়, উদ্দেশ্য নিয়ে। আজকের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শিক্ষাই ছিল আমার মুক্তি। এটি এমন সব দরজা খুলে দিয়েছিল, যার অস্তিত্বই আমি জানতাম না। যদি এটি আমার জীবন বদলে দিতে পারে, তবে তোমাদের জীবনও বদলে দিতে পারবে।”
ড. জাহিদা খান
এই কথাগুলোর গুরুত্ব আছে, কারণ সেগুলো তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে জাহিদার বিয়ে হয়, যখন বেশিরভাগ মেয়েরাই তখনও নিজেদের চিনে নেওয়ার পথে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মা হন। অনেকের কাছে এটি হয়তো শিক্ষাজীবনের ইতি টানত। কিন্তু জাহিদার কাছে সেটাই হয়ে উঠল এক নীরব বিপ্লবের সূচনা। সন্তানকে কোলে নিয়েই তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন।তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, “এক হাতে সন্তান, অন্য হাতে বই, এভাবেই পড়তাম। আমি চাইনি দায়িত্ব আমার শিক্ষার শেষ করে দিক। বরং চেয়েছিলাম শিক্ষা আমার দায়িত্বকে আরও শক্তিশালী করুক।”
তাঁকে এগিয়ে নিয়েছিল বিদ্রোহ নয়, দৃঢ় সংকল্প। পরিবারের সমর্থনও ছিল তাঁর পাশে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি করেসপন্ডেন্সের মাধ্যমে ডাবল গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন, যা ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও সময় ব্যবস্থাপনার অসাধারণ উদাহরণ। কিন্তু তাঁর জ্ঞানপিপাসা তখনও মেটেনি।
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তাঁকে উর্দু সাহিত্যে পিএইচডি করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই যাত্রা ছিল শুধু একাডেমিক নয়, গভীরভাবে ব্যক্তিগতও। তিনি বলেন, “উর্দু সাহিত্য আমাকে কণ্ঠ দিয়েছে। এটি আমাকে অনুভূতি, প্রকাশ এবং সত্য উচ্চারণের সাহস শিখিয়েছে।”
একই সঙ্গে, তাঁর শ্বশুরের মাধ্যমে তিনি ইউনানি চিকিৎসার সঙ্গে পরিচিত হন। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে তিনি এর জ্ঞান ও দর্শন আত্মস্থ করেন এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নানা ইউনানি নুসখা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “প্রাচীন জ্ঞানকে ভুলে গেলে চলবে না। এটি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে এবং শেখায়, বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই আরোগ্যের শুরু।”
পারিবারিক ও শিক্ষাজীবনের বাইরেও সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল প্রবল। তিনি সক্রিয়ভাবে নানা সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং সমতার পক্ষে দাঁড়ান। তাঁর দৃঢ় উচ্চারণ, “যদি কিছু ভুল হয়, তবে আমাদের বলতে হবে। নীরবতা কারও উপকার করে না।”
তাঁর স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস তাঁকে নিয়ে যায় এক নতুন ভূমিকায়, দূরদর্শনের সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে। ক্যামেরার সামনে তিনি দর্শকদের সামনে তুলে ধরতেন স্থিরতা ও স্বচ্ছতা। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল না চাকচিক্যের বিষয়, বরং দায়িত্বের ক্ষেত্র। তিনি বলেন, “শব্দ আত্মবিশ্বাস গড়তে পারে, আবার সমাজকে জাগিয়েও তুলতে পারে। গণমাধ্যম সত্য ও মানুষের মধ্যে এক সেতুবন্ধন।”
পরে তাঁর নেতৃত্বগুণ জাতীয় স্তরেও স্বীকৃতি পায়। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে কর্ণাটক স্টেট ওয়্যারহাউজিং কর্পোরেশনে মনোনীত করে, যেখানে খাদ্য সংরক্ষণ ও বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তিনি বলেন, “খাদ্য শুধু পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার। একে সঠিকভাবে পরিচালনা করা মানে মানুষের জীবনকে সম্মান করা।”
দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তিনি অবসর নেন। কিন্তু অবসর তাঁর জীবনে থেমে যাওয়া নয়, বরং নতুনভাবে শুরু করার নাম। সামাজিক কাজে পুরোপুরি মন দেওয়ার আগে তিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসাতেও সাফল্য পান। কিন্তু ব্যবসায়িক উন্নতির মধ্যেও তাঁর মন টানত মানুষের কল্যাণে। তিনি বলেন, “সম্পদের মূল্য তখনই, যখন তা প্রভাব সৃষ্টি করে। সাফল্যের কোনো মানে নেই, যদি তা অন্যকে উন্নত না করে।”
পরবর্তীতে তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব মুসলিম প্রফেশনালস-এর সঙ্গে যুক্ত হন। তিন দফা কর্ণাটক প্রধান হিসেবে কাজ করে তিনি মেন্টরশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং যুবসমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “একজন মানুষকে ক্ষমতায়ন করলে একটি পরিবার এগোয়। একটি পরিবার এগোলে একটি সমাজ এগিয়ে যায়।”
অনেক সম্মান ও জনজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও জাহিদা বিশ্বাস করেন, সেবার শুরু হয় ঘর থেকেই। তিনি নিজের বৃহৎ পরিবারে বহুজনের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করেছেন। তাঁর মতে, পরিবর্তন প্রথমে নিকটবর্তী পরিসর থেকেই শুরু হয়, তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সমাজে।
এই ভাবনা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “মসীহা” নামের একটি ট্রাস্ট, যা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা ও কল্যাণে কাজ করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সেইসব ছাত্রছাত্রীদের দিকে, যারা একসময় তাঁর মতোই অনিশ্চয়তার মাঝেও আশায় বেঁচে ছিল। তিনি বলেন, “শিক্ষার জন্য সংগ্রাম কী, আমি জানি। যদি কারও সেই পথটা একটু সহজ করতে পারি, সেটাই আমার প্রকৃত সাফল্য।”
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে, কিশোরী বধূ, সংগ্রামী ছাত্রী, গবেষক, সংবাদকর্মী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও সমাজনেত্রী, ড. জাহিদা খান সবসময় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। এটাই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।হাসিমুখে তিনি বলেন, “আমি এখনও একজন ছাত্রী। জীবন নিজেই সবচেয়ে বড় শিক্ষক।”
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিস্থিতি নয়, সিদ্ধান্তই ভাগ্য নির্ধারণ করে। শিক্ষা দায়িত্বের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহমর্মিতার সঙ্গে চলতে পারে, আর নেতৃত্ব তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার ভিত গড়ে ওঠে বিনয়ে।
হুবলির শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রশাসনের করিডর, টেলিভিশন স্টুডিও থেকে তৃণমূল সমাজসেবা, ড. জাহিদা খান অধ্যবসায়ের এক জীবন্ত প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন, যখন আবেগের সঙ্গে উদ্দেশ্য মিলে যায়, তখন বদলে যায় শুধু একজনের জীবন নয়, বদলে যেতে পারে পুরো সমাজ। আর তাঁর নিজের ভাষায়, “একজন নারী শিক্ষিত হলে, একটি প্রজন্ম উঠে দাঁড়ায়।”