শতবর্ষ পেরিয়েও ‘অযোগ্য ভোটার’? কালনার ছাপিয়া বিবির আক্ষেপ ঘিরে প্রশ্নে গণতন্ত্র

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 7 h ago
শতবর্ষ পেরিয়েও ‘অযোগ্য ভোটার’? কালনার ছাপিয়া বিবির আক্ষেপ ঘিরে প্রশ্নে গণতন্ত্র
শতবর্ষ পেরিয়েও ‘অযোগ্য ভোটার’? কালনার ছাপিয়া বিবির আক্ষেপ ঘিরে প্রশ্নে গণতন্ত্র
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

পূর্ব বর্ধমানের কালনা বিধানসভার হাটকালনা পঞ্চায়েত এলাকার এক প্রান্তে বসে আছেন শতবর্ষী ছাপিয়া বিবি শেখ। সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর বয়স এখন ১০১ বছর। দীর্ঘ জীবনে তিনি দেশের অসংখ্য নির্বাচন দেখেছেন—লোকসভা থেকে বিধানসভা, পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা—প্রতিটি ভোটেই নিজের অধিকার প্রয়োগ করেছেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, তাঁর সেই অধিকারই যেন প্রশ্নের মুখে। কারণ, সম্প্রতি প্রকাশিত ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ পড়েছে।
 
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ছাপিয়া বিবির মতো একজন প্রবীণ নাগরিক, যিনি স্বাধীনতার পর থেকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁর নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ল, তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
ছাপিয়া বিবি নিজেও এই ঘটনায় অত্যন্ত ব্যথিত। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন,“১০০ বছর পার করে এখন জীবনের শেষ প্রান্তে। আর এখন আমি অযোগ্য ভোটার হয়ে গেলাম। এত বছর তাহলে কিভাবে ভোট দিয়ে এলাম বলুন তো?”
 
তাঁর কথায় স্পষ্ট ক্ষোভ, আবার একইসঙ্গে অসহায়তাও। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও এখনও তিনি নিজের কাজ নিজেই করেন। দৈনন্দিন জীবনে অন্যের ওপর নির্ভরশীল নন। এমন একজন মানুষের কাছে ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, এটি তাঁর আত্মসম্মানেরও একটি বড় অংশ।
 
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ছাপিয়া বিবি এলাকায় অত্যন্ত পরিচিত মুখ। বহু বছর ধরে তিনি প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিতে যেতেন। এমনকি অসুস্থ থাকলেও চেষ্টা করতেন ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে। তাঁর এই দায়িত্ববোধ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা।
 
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় তিনি কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। এতে শুধু ব্যক্তিগতভাবে তিনি নয়, তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরাও ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে, এটি প্রশাসনিক গাফিলতির ফল।একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,“এই বয়সেও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে চাইতেন। অথচ এখন তাঁকে বলা হচ্ছে তিনি ভোটার নন! এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
 
এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কীভাবে একজন শতবর্ষী ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ল? এটি কি তথ্য হালনাগাদের সময় কোনো ভুল, নাকি যাচাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রায়শই বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় তাঁরা বাড়িতে না থাকলে বা শারীরিক কারণে উপস্থিত হতে না পারলে তাঁদের নাম ‘অকার্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার কখনও নথিপত্রের অসামঞ্জস্য বা তথ্যের ভুল আপডেটের কারণেও নাম বাদ পড়ে যেতে পারে।
 
তবে এই ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। কারণ, ভোটাধিকার একটি মৌলিক অধিকার, যা কোনো নাগরিকের কাছ থেকে সহজে কেড়ে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে এমন একজন প্রবীণ নাগরিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ভোট দিয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রে এই ধরনের ভুল আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।
 
এদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তবে ছাপিয়া বিবি ও তাঁর পরিবারের কাছে এই আশ্বাস কতটা স্বস্তি এনে দেবে, তা সময়ই বলবে।
 
 
এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যার উদাহরণ নয়, বরং বৃহত্তর একটি বাস্তবতার প্রতিফলন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও অনেক প্রবীণ নাগরিক আছেন, যাঁরা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
 
 
ছাপিয়া বিবির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়—এটি প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণের উপর নির্ভরশীল। আর সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনেরই।জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছাপিয়া বিবির একটাই প্রশ্ন—“আমি কি তবে আর এই দেশের নাগরিক নই?”
 
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রশাসনের নয়, গোটা সমাজের কাছেই প্রাসঙ্গিক।